লাঙ্গলবন্দে স্নানোৎসব চলছে

লাঙ্গলবন্দে স্নানোৎসব চলছে
Share Button

‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর’ এ মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে জগতের যাবতীয় সংকীর্ণতা ও পঙ্কিলতার আবরণে ঘেরা জীবন থেকে পাপমুক্তির বাসনায় ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নানে অংশ নেয় হাজারো পুণ্যার্থী।

বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৩টা ২৪ মিনিটে তিথি অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে লাখো হিন্দু ধর্মালম্বীদের উপস্থিতিতে স্নানোৎসব শুরু হয়। ভোরে শুরু হওয়া তিথি শেষ হবে আজ (বৃহস্পতিবার) রাত ২টা ৪৭ মিনিট ৭ সেকেন্ডে।

এদিকে, সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দেশ বিদেশের পুণ্যার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে লাঙ্গলবন্দের কয়েক কিলোমিটার এলাকা। স্নানোৎসব সুষ্ঠু ও নিরাপদ করতে সেখানে পুরো তিন কিলোমিটার এলাকায় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। মন্দিরগুলোতে ইতোমধ্যেই সাধু সন্যাসীরা সমবেত হয়ে ভক্তিমূলক গান, বাজনা শুরু করেছে।

অন্যদিকে, গত বছরের তুলনায় এ বছর পুর্ণ্যার্থীদের জন্য ৫টি ঘাট নতুন তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও নদীর কচুরিপান পরিষ্কার করা হয়েছে। প্রতিটি ঘাটে রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবরীদলসহ পুলিশের ও স্বেচ্ছাসেবক কর্মীরা।

স্নান ঘাটের ব্রাহ্মণ অনিল চক্রবর্তী ও রনি চক্রবর্তী জানান, পবিত্র নদ ব্রহ্মপুত্রে স্নানমন্ত্র পাঠপূর্বক নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ফুল, বেলপাতা, ধান, দুর্বা, হরিতকি, ডাব ইত্যাদি দিয়ে পিতৃকূলের উদ্দেশ্যে তর্পণ করবে ভক্তরা।

লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎযাপন পরিষদের তথ্য ও যোগাযোগ উপ-কমিটির আহ্বায়ক দিলীপ কুমার মণ্ডল জানান, বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ থেকে সাবদি পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ১৬টি ঘাটে জড়ো হয়ে তিথি হিসেব করে স্নান করবে লাখো পুণ্যার্থী। এ বছর লাঙ্গলবন্দে ১০ থেকে ১৫ লাখ পুণ্যার্থীর আগমন আশা করছেন।

দিলীপ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘ভোর রাত থেকেই পুণ্যার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে স্নান করছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এ বছর এক হাজার পুলিশ ২ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রয়েছে। আশা করছি শান্তিপূর্ণভাবেই স্নানোৎসব শেষ হবে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি শংকর সাহা জানান, এবার মোট ১৬টি ঘাট দিয়ে পুণ্যার্থীরা স্নান করতে পারবে। সেগুলো হলো ললিত সাধুর ঘাট, অন্নপূর্ণ ঘাট, রাজ ঘাট, কালীগঞ্জ ঘাট, মা কুঁড়ি সাধুর ঘাট, গান্ধী ঘাট, বড় দেশ্বরী ঘাট, জয়কালি ঘাট, রক্ষাকালী ঘাট, প্রেমতলা ঘাট, চর শ্রীরাম ঘাট, সাবদি ঘাট, বাসনকালী ও জগৎবন্ধু ঘাটে স্নানের ব্যবস্থা রয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য গত বছরের ২৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নানোৎসবে প্রচণ্ড ভিড়ে পদদলিত হয়ে মা-ছেলে, বউ-শ্বাশুড়ি, অধ্যাপকসহ ১০ পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত আরো ৩০ জন।

 

লাঙ্গলবন্দ স্নানের চমকপ্রদ কাহিনী :

লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সম্পর্কে চমৎকার এক কাহিনী প্রচলিত আছে। হিন্দু পুরান মতে, ত্রেতাযুগের সূচনাকালে মগধ রাজ্যে ভাগীরথীর উপনদী কৌশিকীর তীর ঘেঁষে এক সমৃদ্ধ নগরী ছিল, যার নাম ভোজকোট।

এ নগরীতে ঋষি জমদগ্নির পাঁচ পুত্র সন্তানের মধ্যে প্রথম সস্তানের নাম রুষন্নন্ত, দ্বিতীয় পুত্রের নাম সুষেণ, তৃতীয় পুত্রের নাম বসু, চতুর্থ পুত্রের নাম বিশ্বাসুর, পরশুরাম ছিলেন সবার ছোট। পরশুরামের জন্মকালে বিশ্বজুড়ে চলছিল মহাসঙ্কট। একদিন পরশুরামের মা রেণুকা দেবী জল আনতে গঙ্গার তীরে যান। সেখানে পদ্মমালী (মতান্তরে চিত্ররথ) নামক গন্ধবরাজ স্ত্রীসহ জলবিহার করছিলেন (মতান্তরে অপ্সরীরাসহ)।

পদ্মমালীর রূপ এবং তাদের সমবেত জলবিহারের দৃশ্য রেণুকা দেবীকে এমনভাবে মোহিত করে যে, তিনি তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। অন্যদিকে ঋষি জমদগ্নির হোমবেলা পেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার মোটেও খেয়াল নেই। সম্বিত ফিরে পেয়ে রেণুকা দেবী কলস ভরে ঋষি জমদগ্নির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ান। তপোবলে ঋষি জমদগ্নি সবকিছু জানতে পেরে রেগে গিয়ে ছেলেদের মাকে হত্যার আদেশ দেন। প্রথম চার ছেলে মাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান।

কিন্তু পরশুরাম পিতার আদেশে মা এবং আদেশ পালন না করা ভাইদের কুঠার দিয়ে হত্যা করেন। পরবর্তীকালে বাবা খুশি হয়ে বর দিতে চাইলে তিনি মা এবং ভাইদের প্রাণ ফিরে চান। তাতেই রাজি হন ঋষি জমদগ্নি। কিন্তু মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লেগেই থাকে। অনেক চেষ্টা করেও সে কুঠার খসাতে পারেন না তিনি। এক পর্যায়ে পিতার কথামত পরশুরাম তীর্থে তীর্থে ঘুরতে লাগলেন। শেষে ভারতবর্ষের সব তীর্থ ঘুরে ব্রহ্মপুত্র পুণ্যজলে স্নান করে তার হাতের কুঠার খসে যায়।

পরশুরাম মনে মনে ভাবেন, এই পুণ্য বারিধারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে মানুষ খুব উপকৃত হবে। তাই তিনি হাতের খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারা নিয়ে আসেন। লাঙ্গল দিয়ে সমভূমির বুক চিরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন তিনি। ক্রমাগত ভূমি কর্ষণজনিত শ্রমে পরশুরাম ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করেন। এই জন্য এই স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। এরপর এই জলধারা কোমল মাটির বুক চিরে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। পরবর্তীকালে এই মিলিত ধারা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts