সন্দেহভাজনরা নজরদারিতে, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

bangladesh bank

বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) রিজার্ভের অর্থ চুরির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাদের ঢাকা ত্যাগের ওপর। জরুরি প্রয়োজনে কোথাও যেতে হলে তদন্ত কর্মকর্তাদের অবহিত করতে বলা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে প্রত্যেকের পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। তাদের গতিবিধির ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। এ ধরনের সন্দেহভাজন কর্মকর্তার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় কেলেংকারির তদন্ত করছে সিআইডি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এলাকা থেকে মঙ্গলবার রাতে প্রথমে চার কর্মকর্তাকে আটক করেন। এরা অতি সন্দেহভাজন তালিকায় আছেন। এদের সঙ্গে কথা বলার পর গভীর রাতে আরও ৮ কর্মকর্তাকে তুলে নেয়া হয়। মোট ১২ কর্মকর্তাকে বুধবার ভোর পর্যন্ত মালিবাগ কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখান থেকে সকালে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এর আগে তাদের কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে এগুলো মেনে চলতে বলা হয়। গোয়েন্দা কার্যালয় থেকে ছাড়া পেয়ে ১২ জনই বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অফিস করেছেন। কিন্তু তাদের বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকাণ্ডের স্বার্থে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ও গোপন রাখতে বলা হয়। এদের সতর্ক নজরদারিতে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আটকের পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলেন- বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক মিজানুর রহমান, আবদুল্লাহ সালেহ ও প্রভাস চন্দ্র, সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন, রফিক আহমেদ মজুমদার, সনজিৎ রায় ও আইটি বিভাগের দেব দুলাল রায়। এছাড়া বুধবার মামলার বাদী যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদাকেও জেরা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এসব কর্মকর্তার পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সিআইডি ও ছায়া তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, নজরদারিতে থাকা ১২ জনের মধ্যে চারজন হলেন অতি সন্দেহভাজন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের মতো পরিবেশ ছিল না। তাই তাদের মঙ্গলবার সিআইডি কার্যালয়ে আনা হয়। পরে তাদের আরও নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আমরা কিছু ইলেকট্রনিক প্রমাণের অপেক্ষায় আছি। তারপরই রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে।
ছায়া তদন্তকারী সংস্থার একটি সূত্র জানায়, সন্দেহভাজনদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। এদের তালিকা যাচাই-বাছাই চলছে। দেশীয় চক্রে জড়িতদের পাশাপাশি যারা অর্পিত দায়িত্ব পালনে গাফিলতি বা অবহেলা করেছেন তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।

মঙ্গলবার মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের হওয়ার পরপর রাতেই নথিপত্র বুঝে নেয় সিআইডি। বুধবার সিআইডির তদন্ত দল দিনভর বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিজেদের অফিসে ফিরে তারা সিআইডি প্রধানের সঙ্গে বৈঠকও করেছে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে তারা ইন্টারপোলসহ বিদেশী সংস্থারও সাহায্য নেবে। সিআইডি ৫ সদস্যের একটি টিম গঠন করে ঘটনার তদন্ত করছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিআইডির তদন্ত টিমের অন্যতম সদস্য অতিরিক্ত ডিআইজি শাহ আলম বলেন, ‘দিনভর ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তদন্তে ভালো অগ্রগতি আছে।’ তদন্তে কত সময় লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। আমরা আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই শেষ করব।’ মতিঝিল থানায় করা মামলার প্রতিবেদন ১৯ এপ্রিল আদালতে দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেছেন ঢাকার সিএমএম কোর্ট।

বাংলাদেশের ব্যাংকের রিজার্ভের ১০১ মিলিয়ন ইউএস ডলার চুরির ঘটনায় ৪ থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি সুইফটে ব্যবহৃত সফটওয়্যার অকার্যকর থাকা, ওই সময়ে সম্পাদিত লেনদেনগুলোর তথ্য সফটওয়্যার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রিন্ট না হওয়ার নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করছে সিআইডির তদন্ত দল। একই সঙ্গে ডিলিং শাখার সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখছে তারা। দু’দিন ওই শাখায় সিসিটিভি রহস্যজনকভাবে বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সার্ভার ব্যবহারকারীর তথ্যও পায়নি তদন্ত দল। সার্ভার ব্যবহারকারীদের তথ্য না পাওয়া ও ফুটেজ না মেলায় সন্দেহভাজন কয়েক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ফাইল জব্দ করা হয়। তাদের কে কখন বিদেশ সফর করেছেন সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এছাড়াও সিআইডি সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনের কল লিস্ট ও কল রেকর্ডও যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সিআইডির তদন্ত দলের অনেক প্রশ্নের জবাবই দিতে পারেননি বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট ও আইটি শাখার কর্মকর্তারা। ব্যাংক কর্মকর্তাদের কথাবার্তায় ধরা পড়েছে নানা অসঙ্গতি। দিনভর বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সন্ধ্যায় নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনা বৈঠক করে সিআইডির তদন্ত দল।

ওই দলের একজন সদস্য জানান, চুরির জন্য অপরাধীরা কৌশলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো বেছে নেয়। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে সাপ্তাহিক ছুটির দিন মিলিয়ে চুরির জন্য মোক্ষম সময় ছিল। ৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফটে ব্যবহৃত সফটওয়্যার ঠিকমতো কাজ করছিল না। ৫ ফেব্রুয়ারি ছিল শুক্রবার। ওইদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা স্বয়ংক্রিয় প্রিন্ট না পেয়ে সেটি প্রিন্টারের সমস্যা মনে করে এড়িয়ে যান। পরদিন শনিবারও (৬ ফেব্রুয়ারি) সফটওয়্যার চালু ও প্রিন্ট বের করা সম্ভব হয়নি। বড় ধরনের চুরির আশংকা করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে জানানোর চেষ্টা করা হয় ৬ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন এবং পরদিন (৭ ফেব্রুয়ারি) রোববার যুক্তরাষ্ট্রে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক নিউইয়র্কে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন। ৮ ফেব্রুয়ারি সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট শাখার সফটওয়্যারটি চালু হয়। এর থেকে চুরির বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে ৬টি ব্যাংকে পেমেন্ট বন্ধ করার অনুরোধ করা হয়। চারটি বার্তার মাধ্যমে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে ১০১ মিলিয়ন ইউএস ডলার চুরির বিষয়টি ধরা পড়ে।

মামলার এজাহারে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকে স্থানান্তর হওয়া টাকা আলটিমেট বেনিফিশিয়ারিদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর না করার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের জুপিটার স্ট্রিট মাকাতি সিটি শাখায় বেনিফিশিয়ারিদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে। ১৪ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ফিলিপাইনে যায়। তারা বিষয়টি ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলে উপস্থাপন করে। ফিলিপাইনের আদালত কর্তৃক রিজাল ব্যাংকের বেনিফিশিয়ারিদের হিসাবগুলো স্থগিত করে তদন্তের নির্দেশ দেন।

সিআইডির তদন্ত দলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, চুরির জন্য পরিকল্পিতভাবে সফটওয়্যার অকার্যকর করা হয়।’ এর নেপথ্যে দেশী-বিদেশী চক্র জড়িত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে কারা কারা দায়ী, কার দায় কতটুকু সেটা নির্ণয়ের চেষ্টা করছেন তারা।

বুধবার সিআইডির তদন্ত টিম বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ শাখা, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেট বিভাগ ও পেমেন্ট শাখার এক ডজন কর্মকর্তাকে সম্মিলিত ও আলাদা আলাদা জেরা করেন। এর মধ্যে ছিল তারা কে কিভাবে দায়িত্ব পালন করেন। জেরার বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তারা লিপিবদ্ধ করেছেন। রিজার্ভের অর্থ চুরির আগে ও পরে কে কোথায় কিভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছেন।

তদন্ত দলের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও পেমেন্ট সিস্টেম শাখার অনেক কর্মকর্তাই তাদের কাজ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ নন। ফরেক্স রিজার্ভ শাখার একজন কর্মকর্তার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংকজুড়ে অযোগ্য কর্মকর্তার ছড়াছড়ি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ শাখার তিন কর্মকর্তাকে জেরা করা হলে তারা বলেন, আগে অন্য শাখায় ছিলেন। এ শাখার কাজ সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো ধারণাই নেই। তদন্ত দলের অন্যতম সদস্য সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মির্জা আবদুল্লা হেল বাকী যুগান্তরকে বলেন, আমরা তদন্তের একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। আমরা বুধবার মূলত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তিনি বলেন, ঘটনা তদন্তে বিদেশী সংস্থার সহায়তা নেয়া হবে। ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হানুল ইসলাম। এছাড়া পুলিশ সদর দফতর থেকে আরও একটি তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সুত্র : যুগান্তর

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts

Leave a Comment