এটিএম কার্ড জালিয়াতি : সেই ক্যাপপরা বিদেশী আটক

চার ব্যাংকের ২১ লাখ টাকা লোপাট
Share Button

এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় এক বিদেশী নাগরিককে আটক করেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে পূর্ব ইউরোপের একটি দেশের ওই নাগরিককে আটক করা হয় বলে আইনশৃংখলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে। তাকে পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বনানী ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল) একটি বুথে জালিয়াতির উদ্দেশে ব্যাংক কর্মকর্তা পরিচয়ে ক্যাপ মাথায় দিয়ে ওই বিদেশী প্রবেশ করেছিল।

এদিকে গোয়েন্দারা জানান, এটিএম কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে বাংলাদেশে প্রযুক্তি দক্ষ সাতটি গ্রুপ সক্রিয়। দেশী-বিদেশীর সমন্বয়ে গড়া এসব চক্রের সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলের লোকজনও জড়িত। বিশেষ করে আইটি সেক্টরের কর্মকর্তাদের নিবিড় যোগসূত্র আছে বলে তথ্য পেয়েছেন তারা।

এরা আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির সঙ্গেও জড়িত। ঘটনার ছায়াতদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তদন্তে ভিডিও ফুটেজের পাশাপাশি এক বিদেশী নাগরিকের ফেসবুক আইডির সূত্রকেও কাজে লাগানো হচ্ছে। এছাড়া জালিয়াত চক্রের বিদেশী সদস্যরা সম্প্রতি পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে এসেছেন বলে ডিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান।

আইনশৃংখলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত গ্রুপগুলোর অনেক সদস্য বিভিন্ন সময় ব্যাংকের চাকরি করতেন এবং এদের বেশিরভাগই আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন। এর মধ্যে ইউরোপ ফেরত আইটি বিশেষজ্ঞ সেলিম উদ্দিন সেলিম ও মঞ্জুরুল ইসলাম একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এছাড়া আসাদুল ইসলাম একটি, প্রকৌশলী আরিফ হোসেন একটি, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুর ফেরত প্রযুক্তিবিদ মোশাররফ হোসেন ও বুলগেরিয়ান নাগরিক রোজেন আইলি যৌথভাবে একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ফেরত ও প্রযুক্তি দক্ষ আবদুর রহমান, শ্রীলংকার বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের নাগরিক মোহনাথারাস ও জেনা রহমানের একটি গ্রুপ রয়েছে।

মালয়েশিয়ার নাগরিক রুজিতা বিনতে হালিম ও নুরুদ্দিন আলী, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বাংলাদেশী আবুল উল্লাহ ও মুহিবুর রহমানের গ্রুপও বাংলাদেশে এটিএম কার্ড জালিয়াতিতে জড়িত। এ চক্রগুলোর সঙ্গে জড়িত কয়েকজন বিদেশী সম্প্রতি ইউক্রেন, বুলগেরিয়া, রুমানিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে এসেছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানায়।

পুলিশ ও র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব গ্রুপের বাংলাদেশী সদস্যদের অনেকেই আইনশৃংখলা বাহিনীর চেনামুখ। তাই তারা কৌশল হিসেবে বিদেশী নাগরিকদের বুথে বুথে টাকা উত্তোলন করতে পাঠায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও সদ্য গঠিত কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে যে গ্রুপগুলো সক্রিয় রয়েছে এদেরকে বিভিন্ন সময় পুলিশ গ্রেফতার করে। কিন্তু তারা জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধ করছে।

সম্প্রতি বুথ থেকে জালিয়াতি করে টাকা তোলার পেছনেও এরা জড়িত থাকতে পারে। কারণ এদের সঙ্গে পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা নাগরিকদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ঢাকায় তিনটি ব্যাংকের বুথে বিদেশী নাগরিককে টাকা উত্তোলনের ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে চার থেকে পাঁচজনের চেহারা মিলিয়ে দেখা হয়েছে।

এদিকে জালিয়াতির ঘটনা তদন্তে এক বিদেশীর ফেসবুক আইডির সূত্রকে ব্যবহার করছেন গোয়েন্দারা। এই আইডি থেকে চক্রগুলো সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। জালিয়াতির ঘটনার সময় ‘ভি’ আদ্যক্ষরযুক্ত এই আইডিটি রাজধানীর গুলশান, মিরপুর ডিওএইচএস ও শেওড়াপাড়া এলাকা থেকে ব্যবহার করা হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এর আগে জালিয়াতির অভিযোগে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া সেলিম উদ্দিন সেলিম ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রাইম ব্যাংক, ইউসিবিএল ও এবি ব্যাংকে এটিএম সার্ভিস রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতেন। মঞ্জুরুল ও আসাদুল মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক আইটি কর্মকর্তা। আরিফ হোসেন ছিলেন ব্র্যাক ব্যাংকের আইটি কর্মকর্তা। তিনি বুথে ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট দিতেন।

মোশাররফ হোসেন সিঙ্গাপুরে ইনফরমেটিকস আইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা শুরু করেন। চট্টগ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহমানও আইটিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। গোয়েন্দা পুলিশ ২০১৩ সালের জুলাই মাসের বিভিন্ন সময় তাদের গ্রেফতার করে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সবাই জামিনে বেরিয়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধীদের যাতে শাস্তি হয় সেজন্য কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আইনজীবী আনোয়ারুল ইসলাম বাবুল যুগান্তরকে বলেন, এর আগে এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে আইনের ৪০৬, ৪৬৮ ও ৪২০ ধারায় মামলা করা হয়। সাধারণত এ ধারায় মামলা হলে অপরাধীরা সহজে পার পেয়ে যায়। যেহেতু জালিয়াত চক্রের সদস্যরা রাষ্ট্রের সম্মান ক্ষুণ্ণ করার মতো অপরাধ করছে, তাই তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা কিংবা বড় ধরনের আর্থিক জরিমানাসহ জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা হলে পার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

এ অবস্থায় উল্লিখিত ধারার সংশোধনী আনার সুপারিশও করেন এ আইনজীবী। সরকারের তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বিভাগের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা মনে করেন, এটিএম কার্ড জালিয়াতি করে জামিন পাওয়া অপরাধীরাই এবারের ঘটনার নেপথ্যের কারিগর হিসেবে কাজ করেছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বিদেশীরা। কারণ সাতটি গ্রুপের সঙ্গে একাধিক বিদেশীর যোগসূত্র আছে।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts

Leave a Comment