চার ব্যাংকের ২১ লাখ টাকা লোপাট : ৪ বিদেশি নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ

চার ব্যাংকের ২১ লাখ টাকা লোপাট
Share Button

এটিএম বুথের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে চার ব্যাংকের ৩৬ গ্রাহকের প্রায় ২১ লাখ টাকা লোপাট হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ অর্থ গ্রাহককে এক সপ্তাহের মধ্যে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ইস্টার্ন ব্যাংক তাদের ক্ষতিগ্রস্ত ২২ গ্রাহকের অর্থ আজ ফেরত দিতে যাচ্ছে।

অপর তিনটি ব্যাংকও ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এদিকে সতর্কতা হিসেবে ভবিষ্যতে একজন গ্রাহক দিনে কতবার এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করে দেয়ার কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বুধবার দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এদিকে এটিএম কার্ড জালিয়াতি করে বুথ থেকে টাকা তোলার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় চার বিদেশী নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তথ্য-উপাত্ত এবং ছবির সঙ্গে মিলে গেলেই তাদের গ্রেফতার করা হতে পারে। সন্দেহভাজন এ ব্যক্তিরা ইউক্রেন, বুলগেরিয়া ও রোমানিয়াসহ ইউরোপের নাগরিক বলে দাবি করছেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা।

গত ৬ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাজধানীর গুলশান, মিরপুরের কালশী ও বনানী এলাকার ইস্টার্ন, সিটি ও ইউসিবির চার বুথে স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে কার্ড জালিয়াতি ও পরবর্তী সময়ে গ্রাহকের অজান্তে টাকা তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটে। তবে তা জানাজানি হয় ১২ ফেব্র“য়ারি।

ওই দিন ইস্টার্ন ব্যাংকের একাধিক গ্রাহক মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে নিজেদের হিসাব থেকে টাকা তুলে নেয়ার বিষয়টি জেনে ব্যাংকে অভিযোগ করেন। একসঙ্গে বেশ কিছু গ্রাহকের অভিযোগ পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্তে নামলে এ জালিয়াতির বিষয়টি ফাঁস হয়। পরে কার্ড জালিয়াতির এ ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মামলাও হয়। এর পরপরই তদন্তে নামে পুলিশ, গোয়েন্দা বাহিনী ও র‌্যাব।

জালিয়াতির ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া বুধবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠক থেকে বেশ কিছু নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, এটিএম বুথের সিসি ক্যামেরা কেউ ঢেকে দিলে সঙ্গে সঙ্গেই যেন এলার্ট বেজে উঠে এবং যথাযথ ব্যক্তির অগোচরে যাতে কেউ এটিএম মেশিনে মেরামত কাজ বা কোনো কিছু স্থাপন করতে না পারে।

বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা ছাড়াও সব ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে সাম্প্রতিক ঘটনায় ৩৬ জন গ্রাহকের ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা। এছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) ২৪ জন গ্রাহকের চুরি হয়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার টাকা।

এর বাইরে দি সিটি ব্যাংকের ৪ জন গ্রাহকের ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল) ৭ জন গ্রাহকের ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের একজন গ্রাহকের ৪০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে। এর পরিমাণ আর বাড়বে না বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া ১২শ গ্রাহকের তথ্য চুরি হয়েছে। যাদের সবাইকে এটিএম কার্ড নতুন করে দেয়া হবে।

বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে এটিএম বুথে দৈনিক লেনদেনের সীমা এক এক ব্যাংকের এক এক রকম। এ সীমা সুনির্দিষ্ট করার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। এটি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করা হবে। এছাড়া এখন লেনদেনের তথ্য এসএমএসের মাধ্যমে দিলে কিছু চার্জ কেটে রাখা হয়। এটি তুলে দেয়া যায় কিনা ব্যাংকগুলোকে তা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। এর বাইরে বুথে লেনদেনের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন ও গ্রাহকদের সচেতন করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা এসব বিষয়ে একমত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, কোনো চাপের মুখে গ্রাহককে ব্যাংকগুলো ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না বরং তাদের গ্রাহক সন্তুষ্টির জন্যই এটি করছে তারা। এদিকে জালিয়াতির ঘটনায় সন্দেহভাজন তালিকায় রয়েছে ইউক্রেন, বুলগেরিয়া ও রোমানিয়াসহ ইউরোপের চার নাগরিক। তাদের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য নিশ্চিত হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ চারজনের সঙ্গে আরও কয়েকজন বিদেশী নাগরিক আছেন।

প্রাপ্ত ফুটেজের সঙ্গে যাদের ছবি মিলে যাবে তাকেই গ্রেফতার করা হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সাদা চামড়ার লোক বলে এদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে কিছু নিয়ম-কানুন অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রমাণ মিলে গেলে গ্রেফতার দেখানো হবে। ইতিমধ্যে একজনের ছবির সঙ্গে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তির চেহারা মিলে গেছে। সম্ভাব্য হিসেবে তিনি ইউক্রেনের নাগরিক। এদিকে তিনটি ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের ঘটনায় তিনটি মন্ত্রণালয় থেকেও তদন্তে সমন্বয় করা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশীরা একা এ কাজ করেননি। এদের  নেপথ্যে কারিগর হিসেবে আরও অনেকেই আছেন। বাংলাদেশী তিন উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও আইটি বিশেষজ্ঞ রয়েছেন এদের সঙ্গে। এদের মধ্যে সেলিম উদ্দিন একজন। তিনি বিভিন্ন সময় ইউরোপে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আইটিতে।

একই সঙ্গে বিদেশ ফেরত আবদুর রহমানের একটি সংঘবদ্ধ বিদেশী সিন্ডিকেট রয়েছে ইউরোপের জালিয়াত চক্রে। আর বুলগেরিয়ান নাগরিকের সঙ্গে সম্পর্ক রেেয়ছে মোশাররফ নামে আরেক যুবকের। এরাই মিলেমিশে ঢাকায় তিনটি ব্যাংকে কার্ড জালিয়াতি করে টাকা তুলে নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তদন্ত সূত্র জানায়, সব তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিতের পর গ্রেফতার দেখানো হবে বিদেশী নাগরিককে। এ চক্রের সঙ্গে আইটি বিশেষজ্ঞ ছাড়াও ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরের লোক জড়িত আছে। তারা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে টাকা তুলতে সক্ষম হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও নবগঠিত কাউন্টার টেরিরিজম ইউনিটের প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, ইতিমধ্যে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তের কিছুটা অগ্রগতি আছে।

চার থেকে পাঁচজন বিদেশীকে শনাক্ত করা গেছে। এর মধ্যে কারা জড়িত তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, উচ্চপ্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশ ফেরত চক্রকে দু’তিন বছর আগে গ্রেফতার করেছিল ডিবি। তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এবারে ঘটে যাওয়া অপরাধের মিল পাওয়া যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের গ্রুপটিও এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
জানা গেছে, ইউরোপের চক্রের সঙ্গে সেলিম ও আবদুর রহমান নামে দু’ব্যক্তির জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে ডিবির কাছে। পাশাপাশি বুলগেরিয়ান নাগরিক রোজেন আইলির সঙ্গে মোশাররফ নামে আরেক প্রযুক্তিবিদের সম্পর্ক ছিল। সেলিম, মোশাররফ ও রহমানকে ধরতে অভিযান চলছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম যুগান্তরকে বলেন, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভালো ফলাফল আশা করা যাচ্ছে। জড়িত বিদেশী নাগরিকদের আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি নেপথ্যে যারা আছেন তাদেরও কব্জায় আনা হচ্ছে।
সরকারের তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বিভাগের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা যুগান্তরকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়াও অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও আইসিটি মন্ত্রণালয় এ তদন্তে নানা ধরনের সহায়তা করছে।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts

Leave a Comment