পুলিশ ও সোর্সের টানাহেঁচড়ায়ই চা দোকানি বাবুলের গায়ে আগুন লাগে

পুলিশ ও সোর্সের কারণেই বাবুলের গায়ে আগুন লাগে
Share Button

পুলিশ সদস্য ও সোর্সের টানাহেঁচড়ার কারণেই কেরোসিনের চুলা থেকে তেল ও আগুন গায়ে লেগে চায়ের দোকানদার বাবুল মাতব্বর (৪৫) দগ্ধ হন।

ঘটনার সময় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী এক কিশোর এবং অন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে এমন তথ্য দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম জানতে পারে।

প্রত্যক্ষদর্শী দু’জন জানান, পুলিশের কয়েকজন সদস্য ও তিন সোর্স মিলে বুধবার রাতে বাবুলের দোকানে এসে চাঁদা দাবি করেন। তখন বাবুল চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ সদস্য ও সোর্স মিলে তাকে টেনে থানায় নিয়ে যেতে চান। এ সময় এক পুলিশ সদস্য লাঠি দিয়ে বাবুলের দোকান ভাঙতে থাকেন। লাঠির একটি আঘাত কেরোসিনের চুলায় লাগে। সেখান থেকে তেল ও আগুন বাবুলের গায়ে ছিটে লাগে। এতে বাবুল দগ্ধ হন।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কিশোর দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে আমি সাইকেল চালিয়ে ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন দেখি বাবুল কাকার সঙ্গে পুলিশসহ কয়েকজনের মধ্যে তর্কাতর্কি হচ্ছে। সামনে গিয়ে দেখি, এসআই শ্রীধাম ও সোর্স দেলোয়ার তার কাছে সাত হাজার টাকা চাঁদা চাইছে। কিন্তু কাকা (বাবুল) তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে শ্রীধাম ও দেলোয়ার বাবুলের হাত ধরে টেনে দোকান থেকে বের করে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে।’

ওই কিশোর বলে, ‘এমন সময় অন্য এক কনস্টেবল লাঠি দিয়ে দোকান ভাঙতে শুরু করে। সে বলতে থাকে— ওরে থানায় নিয়া চলেন, তাইলে টাকা বাইর হইব। এ কথা বলতে বলতে ওই কনস্টেবল যখন চায়ের দোকান ভাঙছিল তখন লাঠির একটি আঘাত চুলায় এসে পড়ে। এতে চুলার তেল ও আগুন বাবুল কাকার গায়ে পড়লে তিনি দগ্ধ হন। এ সময় ভয়ে পুলিশ ও সোর্সরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।’

মামলার এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি আইয়ুবকে স্থানীয়রা বুধবার রাতেই আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু পুলিশের অবহেলায় আইয়ুব থানা থেকে পালিয়ে যায়। স্থানীয় শামসুন্নাহার এ তথ্য দ্য রিপোর্টকে নিশ্চিত করেন। ওই সময় ওসি শাহিন মণ্ডল জানান, ডিউটি অফিসারের অসতর্কতায় মাদক ব্যবসায়ী আইয়ুব পালিয়ে যায় বলে শুনেছি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অন্য প্রত্যক্ষদর্শী ভ্যানচালক মনিরুজ্জামান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বুধবার রাতে পুলিশের এসআই রবিন চন্দ্র মণ্ডল ও শ্রীধাম, এএসআই এমদাদুল হক ও কনস্টেবল জসীমসহ আরও কয়েক পুলিশ সদস্য গুদারাঘাট কাজীফুরি কিংশুক সিটির পাশেই বাবুলের চায়ের দোকানে আসেন। সঙ্গে আসেন পুলিশের সোর্স দেলোয়ার ও আইয়ুব। তারা বাবুলকে বলেন— ওসি স্যার তোরে ডাকছে। চল থানায় যাইতে হইবো। সারাদিনের যা কামাই করছোস নিয়া চল। বাবুল বলেন— শামসুন্নাহার আইলে যামু। তখনই তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।’

বাবুলের বড় ছেলে মো. রাজু দ্য রিপোর্টকে জানান, মাদক ব্যবসায়ী পারুলীর সঙ্গে তার বাবার আগে থেকেই দ্বন্দ্ব রয়েছে। পারুলী ও বাবুলের বাড়ি একই গলিতে। পারুলীর কাছে যারা মাদক কিনতে আসত তাদের জন্য বেশ কয়েকবার ভোগান্তিতে পড়েছিল বাবুলের পরিবার। বছর খানেক আগে ৯০ কেজি গাজাসহ পারুলীকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেন বাবুল। এ ছাড়া এলাকায় গাঁজা বিক্রি বন্ধের জন্য অনেকবার প্রতিবাদ করেছেন তিনি। কিন্তু পারুলী পুলিশের সহায়তায় বার বার বাবুলের পরিবারকেই হেনস্তা করে আসছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার রাতে ওই ঘটনা ঘটে। এলাকায় পুলিশ সোর্সের মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (ডিসি, মিরপুর) কাইয়ুমুজ্জামান দ্য রিপোর্টকে জানান, ওই ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, বৃহস্পতিবার শাহ্‌ আলী থানা থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় মাদক ব্যবসায়ী পারুল ওরফে পারুলী ও সোর্স দেলোয়ারসহ মোট সাতজনকে আসামি করে মামলা করেন বাবুল মাতব্বরের বড় মেয়ে রোকসানা।

মামলা দায়েরের পর রোকসানা আক্তার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমার বাবার গায়ে আগুন দিয়ে খুন করার জন্য দায়ী শাহ্ আলী থানা পুলিশের এসআই, কনস্টেবলসহ স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী পারুলী, পুলিশের সোর্স দেলোয়ার, আইয়ুব আলী ও রবিন। তাদের নামে মামলা করতে থানায় যাই। কিন্তু তারা বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে হলে মামলা নেওয়া যাবে না। তারা আমাকে বাধ্য করে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা না দিতে।’

যে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা (মামলা নম্বর-৫) করা হয়েছে তারা হলেন— মাদক ব্যবসায়ী মোছা. পারুল ওরফে পারুলী (৪০), পুলিশের সোর্স দেলোয়ার হোসেন (৩২), মো. আইয়ুব আলী ও মো. রবিন (২৫), শঙ্কর (৩০), দুলাল হাওলাদার (৪০) ও পারভীন (৩৫)।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ্ আলী থানার এসআই মোক্তারুজ্জামান দ্য রিপোর্টকে জানান, মামলার তদন্তকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী পারুলকে বৃহস্পতিবার বিকেলে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার দুপুরে শাহ্‌ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম শাহিন মণ্ডলকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শাহ্‌ আলী থানার পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর আগে তাদের ক্লোজড করা হয়। তারা হলেন— শাহ্ আলী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মমিনুর রহমান, শ্রীধাম চন্দ্র হাওলাদার ও নিয়াজউদ্দিন মোল্লা, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) জোগেন্দ্রনাথ এবং কনস্টেবল জসীমউদ্দীন। তারা ঘটনার সময় ওই এলাকার দায়িত্বে ছিলেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের পরিবারের বক্তব্যে এসআই রবিনের নাম আসলেও তাকে প্রত্যাহার করা হয়নি।

ঘটনাটি তদন্তে পুলিশের মিরপুর বিভাগ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) হেড কোয়ার্টার্স থেকে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মারুফ হোসেন সরদার দ্য রিপোর্টকে জানান, পুলিশের মিরপুর বিভাগের তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন— অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মাসুদ আহমেদ ও সহকারী কমিশনার (এসি) মাহবুব হোসেন। ডিএমপি হেড কোয়ার্টার্সের তদন্ত কমিটিতে প্রধান করা হয়েছে ডিসি (ডিসিপ্লিন) টুটুল চক্রবর্তীকে। তদন্ত কমিটিকে শীঘ্রই প্রতিবেদন জমার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার প্রসঙ্গে তিনি জানান, নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। এরই মধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। চা বিক্রেতার মৃত্যুর ঘটনায় তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, রাজধানীর মিরপুর গুদারাঘাট এলাকায় বুধবার রাতে চাঁদা না পেয়ে বাবুল মাতব্বর নামে এক চা বিক্রেতার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় পুলিশ সদস্য ও সোর্স। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে মারা যান তিনি। বাবুল মাতব্বর গুদারাঘাট এলাকার সাত নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসায় থাকতেন। এলাকায় তার একটি চায়ের দোকান আছে। স্ত্রী ও ৫ ছেলে-মেয়ে নিয়ে তার সংসার। সূত্র : দ্য রিপোর্ট

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts

Leave a Comment