ছাত্রীদের যৌন হয়রানি বন্ধে স্কুলে অভিনব নিয়ম!

ছাত্রীদের যৌন হয়রানি বন্ধে স্কুলে অভিনব নিয়ম
Share Button

ছাত্রীরা স্কুলে যায় সপ্তাহে তিনদিন। বাকি তিনদিন যায় ছাত্ররা! পঠনপাঠন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে এমনই ‘ব্যবস্থা’ কায়েম হয়েছে বীরভূমের স্কুলে। স্কুলটির নাম— বড়রা উচ্চ বিদ্যালয়। রয়েছে খয়রাশোল ব্লকের বড়রা-তে।

যেকোনো উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ শ্রেণি হল একাদশ ও দ্বাদশ। খয়রাশোলের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বড়রা গ্রামের এই স্কুলটিতে সেই দুটি ক্লাসের পড়ুয়ারাদের জন্যই লাগু হয়েছে এমনই অভিনব বিধি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির কলাবিভাগে পড়ুয়াদের সংখ্যা প্রচুর। সেই তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা নগণ্যই। এদিকে ক্লাসে হাজির হয়ে পড়ুয়াদের উচ্ছৃঙ্খলতার মাত্রা ছাড়াচ্ছে দিনের পরে দিন। বিশেষ করে ছাত্রদের একাংশের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের উত্যক্ত করা, ক্লাসের ভিতরে মোবাইলে ছবি তোলা, অশ্লীল ভিডিও দেখা, অশোভনীয় অঙ্গভঙ্গি, চিৎকার চেঁচামেচির অভিযোগ এখন নিত্যদিনে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুটঝামেলার মুখে পড়তে হচ্ছিল স্কুল কর্তৃপক্ষকে।

বহু ব্যবস্থা নিয়েও লাগাম টানতে পারছিলেন না শিক্ষকরা। এমনই ব্যাখ্যা দিয়ে প্রাইভেট টিউশনের মতো স্কুলেও ক্লাসকে তিনদিন করে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। স্কুলেরই এক শিক্ষকের থেকে জানা গিয়েছে, প্রায় পনেরো দিন ধরে এমনই চলছে। সোম-বুধ-শুক্র স্কুলে আসে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্ররা আর মঙ্গল-বৃহস্পতি-শনি স্কুলে আসে ছাত্রীরা।

বড়রা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাঞ্চন অধিকারী শাসকদলের জেলার নেতা এবং স্থানীয় বড়রা পঞ্চায়েতের উপ-প্রধান বলে জানা গিয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘বিস্তীর্ণ এলাকার ছাত্র-ছাত্রীরা বিপুল পরিমাণে ভর্তি হচ্ছে আমার স্কুলে। পড়ুয়ার সংখ্যা ২৪০০-এরও বেশি। কো-এড স্কুল। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে গড়ে ২০০-রও বেশি ছাত্রছাত্রী রয়েছে। বিপুল পরিমাণ পড়ুয়া থাকায় ক্লাস সুষ্ঠুভাবে করা যাচ্ছে না। তাছাড়াও উশৃঙ্খল ছাত্রের আচার আচরণ নিয়েও বিদ্যালয়ে অশান্তি হচ্ছে। তাই শিক্ষক-অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে, পরীক্ষামূলকভাবে এমন পদক্ষেপ করা হয়েছে। দিনকয়েক যাওয়ার পরে পড়ুয়াদের উপস্থিতির হার কমলে প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত বদল করা হবে।’’

স্কুলের একাংশ শিক্ষকের মত, এমন পদক্ষেপ কখনই কোনো এক উচ্চ বিদ্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত নয়। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে। তাঁরা মনে করছেন, এই নতুন পদ্ধতিতে পরিপূর্ণ পাঠদান, সময়ে সিলেবাস শেষ, প্রকৃত নজরদারিতে ঘাটতি হবে এবং তাতে ছাত্রছাত্রীদেরই পড়াশোনায় ক্ষতি হবে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, স্কুলে রয়েছেন পূর্ণ সময়ের মাত্র ২৫ জন শিক্ষক ও আংশিক সময়ের পাঁচজন শিক্ষক। একাদশ শ্রেণির কলা বিভাগে বর্তমানে পড়ুয়ার সংখ্যা ২২৫ (ছাত্র-৯৫, ছাত্রী ১৩০) এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে ২১৪ জন (ছাত্র-৮৭, ছাত্রী ১২৭)।
এই স্কুলেরই প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক জামালউদ্দিন আহমেদের মত, ‘‘৪১ বছর এই স্কুলে শিক্ষকতা করেছি। এমন পদক্ষেপ করতে হয়নি। ছাত্রছাত্রীদের কাছে ঘটনার কথা শুনে অবাক হয়েছি। ছাত্রছাত্রীদের দুষ্টুমি, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, তা নিয়ে অভিযোগ-অসন্তোষ ছেলেমেয়েদের মধ্যে অপরিণত বয়সের অনভিপ্রেত ব্যবহার— এ তো আগেও ছিল। পরেও থাকবেও। পড়ুয়াদের বোঝাতে হবে, প্রয়োজনে ধমক দিতে হবে। না হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে শাস্তি দিতে হবে। আগেও তাই করা হত। কিন্তু এখন শুনে যা মনে হচ্ছে সমস্যা সমাধানে শুধু শিক্ষক নয়, প্রশাসন-সহ সমাজের শিক্ষানুরাগী সমস্ত মানুষকে উদ্যোগী হতে হবে।’’
জানা গিয়েছে, খয়রাশোল ব্লকের বড়রা, পারশুন্ডি, কৈথি, বাবুইজোর, গেরুয়াপাহাড়ি, নবসন প্রভৃতি এলাকা থেকে ছাত্রছাত্রীরা পড়তে আসে বড়রা স্কুলে। তিল তিল করে গড়ে ওঠা ঝাড়খণ্ড-লাগোয়া প্রত্যন্ত গ্রামের এই স্কুলের পরীক্ষার ফলাফলও খুব ভাল হয়। তাই স্কুলে এমন ঘটনায় হতাশ এবং উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। বড়রা গ্রামের এক ছাত্রীর অভিভাবক জানিয়েছেন, ‘‘মেয়ে ভূগোল নিয়েছে। কঠিন বিষয়। এভাবে চললে সিলেবাস শেষ হবে কি না সন্দেহ।’’ একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রের কথায়, ‘‘আমরা চাই সপ্তাহে সাতদিনই ক্লাস হোক। না হলে খুব সমস্যা হবে। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটবে।’

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts