ট্রেনের লেডিস কামরায় কি হয়?

ট্রেনের লেডিস কামরায় কি হয়?
Share Button

লেডিস কামরার আলাদা গন্ধ আছে। শুধু কসমেটিকস্ নয়, ঘামের গন্ধও আছে। গোপন কথাও আছে অনেক। সে যে এক সম্পূর্ণ মেয়েলি জগৎ। জানলায় উঁকি মেরে কি আর সব জানা যায়! ‘লেডিস কামরা’ যে ছেলেদের জন্য একেবারেই ‘নিষিদ্ধ’।

মাতৃভূমি লোকাল নিয়ে যারা মারামারি করেন, তারা লেডিস কামরার আসল যাত্রীই নন। গোটা ট্রেনের দখলের চেয়ে, ছোট একটা কামরায় ‘লেডিজ-ঘনত্ব’ বেশি থাকে। সেখানেই ফুটে ওঠে ‘লেডিস মাহাত্ম্য’। কোথাও এতটুকু পা রাখার জায়গা নেই। তারই মধ্যে, চানাচুর, ঘটি-গরম, বালিতে ভাজা বাদামওয়ালা। এমনকী সায়া-ব্লাউজ, ইমিটেশন গয়নাও। এটা ‘লেডিস কামরা’ স্পেশাল আইটেম। তারই মধ্যে ‘টলি-বলি-টেলি’। ভিড়ের মধ্যে এর ‘সুখ’ ওর ‘দুঃখ’ গায়ে গায়ে লেগে থাকে।

আসল বিষয় সেই স্পেশাল কামরার স্পেশাল আলোচনায়। আইবুড়ো বোন, বান্ধবী, ননদের ঘটকালিও চলে কামরায় বসে বসে। আর আছে চিরন্তন ‘দজ্জাল’ শ্বাশুড়ির ‘সুখ্যাতি’ করা। তাদের ‘টাইট’ দিতে কে কতটা পারদর্শী, কার কী ‘ফর্মুলা’ সে সব শুনলে সমৃদ্ধ হতেই হবে। না হয়ে উপায় নেই। চৈত্র সেল-এ কোথায় কত ছাড় থেকে কোন সিরিয়ালের কত টিআরপি সব কিছুর আন্দাজ মিলে যাবে লেডিস কম্পার্টমেন্টে। এখানেও আবার গ্রুপ আছে। দলে বেঁধে খাওয়া আছে। শীতকালের পিকনিক আছে। পৌষে পিঠে-বিলি, বৈশাখে আম-মাখার চড়ুইভাতি আছে।

লেডিস কামরা স্পেশাল হকারের কথা তো আগেই বলেছি। তারই অন্যতম হয়ে ওঠেন হরেক-মালের পসারি। সংসারের টুকিটাকি থেকে হার, কানের দুল, ক্লিপ, রুমাল, চাবির রিং, ভ্যানিটি ব্যাগ, সেফটিপিন— সব পাবেন। পূজার সময় কোনও যাত্রীই হয়ে ওঠেন হকার। ‘বুটিক-বৌদি’ নিজের পসরা নিয়ে আসেন সহযাত্রীদের জন্য। ট্রেনের মধ্যেই চলে ধার-বাকির কারবার। মাসে মাসে ইনস্টলমেন্ট।

আর আছে ‘ছেলেবাজি’। যাকে তাকে নয় অবশ্য। সব লেডিস কামরাই আলাদা আলাদা দর্শক আছে। আসলে ট্রেন অনুসারে প্যাসেঞ্জার তো এক। তাই অমুক ট্রেনের তমুক কামরার অমুক মেয়ের ‘রোমিও’ তমুক স্টেশনে জানলা বরাবর দাঁড়িয়ে থাকবেই। আবার উল্টোটাও আছে। অমুক স্টেশন দিয়ে যাওয়ার সময় তমুককে ঝাড়ি মারতে হবে। হা হা হাসিতে ঢলে পড়া আছে একে অপরের গায়ে।

লেডিস কম্পার্টমেন্টের নারীদের কিন্তু আহা-উহু গোছের ভাববেন না। দেখলেই বোঝা যায় কোমর বেঁধে ঝগড়া করতে পারেন। দরজায় ঝোলেন ফাঁকা ট্রেনেও। কেন জানেন? পাহারাদার হিসেবে। কোনও ‘বিচ্ছু ছোকরা’ যাতে উঠে না পরে। অন্দরমহলে পুরুষের প্রবেশাধিকার নেই। লেডিস কম্পার্টমেন্টে কথার ফোয়ারা যখন ছুটবে তখন সেই সঙ্গে অঙ্গভঙ্গির সঙ্গতও দেখার মতো। আর সেই আচরণে কোনও ‘শিক্ষিত-অশিক্ষিত’, ‘ভদ্দরলোক-ছোটলোক’ ফারাক নেই। ‘অসভ্য’ কথার ফোয়ারা ছেলেদের রকবাজিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। এটাই তো একমাত্র জায়গা যেখানে ‘পিরিয়ড’ নিয়ে কথা বলতে ফিসফাস করতে হয় না। যৌনতা নিয়ে আলোচনায় মানা নেই। পুরুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে খুল্লামখুল্লা টিটিকিরিতে বাধা নেই। আরও আরও অনেক গুহ্য কথা বলে ফেলা যায় গলা ছেড়ে।

এখানে সবাই এক। সবাই ‘লেডিস’। কেউ টিচার, কেউ মাছওয়ালি, কেউ বেসরকারি সংস্থার রিসেপসনিস্ট, কেউ আবার বার ডান্সার। কিন্তু ওরা সবাই আসলে এক একজন ‘লক্ষ্মী’। সংসারের লক্ষ্মী। পুরুষতান্ত্রিক নানা ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে যাদের জীবন চালাতে হয় তাদের কাছে এটা একটা স্বীকৃত নিজস্ব জগৎ। একদম নিজস্ব— ‘লেডিস কামরা’।

প্রতিবেদন : এবেলা।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts