মেয়েদের মাসিক বা পিরিয়ড কেন হয়?

মেয়েদের মাসিক বা পিরিয়ড কেন হয়

নারীদের প্রজনন প্রক্রিয়ায় প্রভাবকারী একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হচ্ছে মাসিক। ডিম্বাশয়, ডিম্বাশয় হতে বহির্গত হওয়ার নালি (Fallopian tube), জরায়ু, এন্ডোমেট্রিয়াম (Endometrium) এবং যোনির সমন্বয়ে তৈরি প্রজনন অঙ্গ তলপেটে অবস্থিত। মাসিক চক্রের সময় শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনে আছে এসট্রোজেন এবং প্রজেসটেরোন যা শরীরকে গর্ভবস্থার জন্য তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করে।
সাধারণত, প্রতি ২৮ দিন পরপর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসৃত হয়, যা জরায়ুর দুই পাশের নালি (Fallopian tube) দিয়ে জরায়ুর মধ্যে প্রবেশ করে। গর্ভধারণ না করলে, অনিষিক্ত ডিম্বাণু এবং জরায়ুর আবরণ (এন্ডোমেট্রিয়াম) একত্রে প্রত্যেক চক্রে শরীর থেকে ঝরে যায়। একেই মাসিক তৈরি হওয়া বা রজঃস্রাব (Menstruation) বলা হয়।

মাসিক কখন শুরু এবং শেষ হয়

নারীদের প্রজনন বয়:সন্ধি প্রক্রিয়া কার্যক্রম শুরু হয় সাধারণত: ১০-১৯ বছরের মাঝামাঝি বয়সে। এ সময়ের মধ্যে সাধারণত মেয়েদের প্রথম মাসিক হয়ে থাকে। কোনো কোনো মেয়েদের ৯ বছর বয়সে, আবার কারো কারো ১৬ বা তার অধিক বয়সে প্রথম মাসিক হয়। বেশির ভাগ মেয়েদেরই ১২ বছর বয়সে মাসিক শুরু হয়। যখন রজঃনিবৃত্তি বা মেনোপজ হয় তখন মহিলাদের এই মাসিক স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত ৫০ বছর বা তার অধিক বয়সে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়।

মাসিকের প্রয়োজনীয়তা

মাসিক হলে অনেক ক্ষেত্রেই উঠতি বয়সের মেয়েরা বিরক্তি বা অস্বস্তিবোধ করে থাকেন। কিন্তু শরীর ও মনের সুস্থতা ও স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য সময়মতো মাসিক হওয়া প্রতিটি মেয়ের জন্যই জরুরি। নিম্নে মাসিকের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো-

মা হওয়ার ক্ষেত্রে

গর্ভধারণে মাসিকের মাধ্যমেই একজন নারী গর্ভধারণের জন্য জৈবিকভাবে প্রস্তুতি লাভ করে। নিয়মিত মাসিক না হলে একজন নারীকে ভবিষ্যতে মা হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়।

হরমোনের ভারসাম্য

হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় নিয়মিত মাসিকই জানান দেয় যে আপনার দেহের হরমোনগুলোতে ভারসাম্য আছে। যদি হরমোন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে এবং সঠিকভাবে কাজ না করে তবে প্রি-ম্যানসট্রুয়াল সিনড্রম (পিএমএস) দেখা দেয়। এ সময় প্রচণ্ড ক্লান্তিবোধ, শরীরের ওজন বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

রাগ ও বিষণ্ণতা নিয়ন্ত্রণে

মানসিক সুস্থতায় পুরো মাসিক প্রক্রিয়াটি শরীরের পাশাপাশি মনের ওপরও বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে। নিয়মিত মাসিক হলে রাগ ও বিষণ্ণতা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

হরমোনের গতিবিধি

সামগ্রিক হরমোনাল স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে মাসিকের রক্তের রং জানান দিতে পারে দেহের হরমোনের ভারসাম্যের অবস্থান। ২৮ দিনের মাসিক চক্রের সময় দেহের হরমোনগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকে যা মাসিকের রক্তের রঙের ওপর প্রভাব ফেলে এবং যার মাধ্যমে হরমোনের সামগ্রিক গতিবিধি বোঝা যায়।

যেভাবে বুঝবেন মাসিক হয়েছে মাসিক পূর্ব সিনড্রম

এর ফলে মাসিকের পূর্বে মহিলাদের নিম্নলিখিত মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তনগুলো দেখা যায়: মাথা ব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, খিদে না পাওয়া, বমি বমি ভাব, স্তন ফুলে যাওয়া। অল্পতেই অবসাদ অনুভব করা, ঘুমের সমস্যা, কোনো কোনো মহিলার ক্ষেত্রে মেজাজের পরিবর্তন হওয়া ও খিটখিটে হয়ে যাওয়া।

টক্সিক শক সিনড্রোম

সাধারণত:এই সমস্যা খুব কম হতে দেখা যায়। মাসিকের সময় রক্ত শুষে নেয়ার জন্য যে তুলা ব্যবহার করা হয় তা থেকে এই সমস্যা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে একটি তুলার প্যাড ব্যবহার করা অথবা তুলার রক্ত বা ক্লোরিন অথবা রেয়ন জাতীয় তুলা থেকে এলার্জিজনিত কারণে এই সমস্যা দেখা যায়।

মাসিকের সময় করণীয়

মাসিক শুরু হওয়ার আগেই মাসিককালীন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা দরকার। মাসিকের সময় স্বাস্থ্যের বিশেষভাবে যত্ন নেয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা জরুরি, যাতে পরবর্তীকালে কোনো জটিলতার সৃষ্টি না হয়।

সুষম খাবার গ্রহন

ক্যালেন্ডার বা ডায়েরিতে মাসিক শুরু ও শেষ হওয়ার তারিখে দাগ দিয়ে মাসিক চক্র পর্যবেক্ষণ করা দরকার মাসিকের সময় সুষম খাবার খেতে হবে যাতে দেহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়।

ব্যবহৃত প্যাড বা কাপড় যথাস্থানে ফেলা

ব্যবহৃত প্যাড বা কাপড় কাগজ দিয়ে ভালোভাবে মুড়িয়ে আবর্জনায় ফেলতে হবে। টয়লেটের মধ্যে কোনোভাবেই ফেলা যাবে না, নয়তো সুয়ারেজ লাইন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

প্যাড বা কাপড় পরিবর্তন

প্রতি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পরপর প্যাড বা কাপড় পরিবর্তন করা, যাতে করে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ না হয়। রক্তপ্রবাহ বেশি হলে আরও কম সময়ের মধ্যেও পরিবর্তন করা যেতে পারে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

যথাযথভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা দরকার ও মাসিকের দিনগুলোতে নিয়মিত গোসল করতে হবে।

কর্মচঞ্চল জীবনযাপন

মাসিকের সময় মানসিক চাপমুক্ত থেকে ও দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কর্মচঞ্চল জীবনযাপন করতে হবে।

মাসিকের সময় যেসব খাবার খাবেন

মাসিকের সময় সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করতে হবে যেমন : শর্করা সংবলিত-শস্য, ডাল, শাকসবজি, দই, আলু খেতে হবে আমিষ জাতীয় খাদ্য যেমন : দুধ, ডিম, বাদাম, মাছ ও মাংস খেতে হবে আয়রন বা লৌহ জাতীয় খাদ্য যেমন-ডিম, সিম, পালংশাক, আলু, কলা, আপেল, গুড়, খেজুর, কালোজাম ইত্যাদি খেতে খেতে হবে ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন-বাদাম, সয়াবিন, গাঢ় সবুজ শাকসবজি খেতে হবে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার-দুগ্ধজাত খাবার, দুধ, ডিম, বাদাম (Almond), এবং সয়াবিন খেতে হবে কম লবণযুক্ত খাবার খেতে হবে তাজা ফলের রস পান করতে হবে এবং অতিরিক্ত চা-কফি পান থেকে বিরত থাকতে হবে প্রতিদিন ৮-১০ গ্লাস পানি পান করতে হবে।

মাসিককালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

১. মাসিকের সময় পরিষ্কার অন্তর্বাস, পরিষ্কার মাসিকের কাপড় বা প্যাড ব্যবহার করা।

২. মাসিকে ব্যবহৃত কাপড় তিন মাস পরপর পরিবর্তন করে ফেলা।

৩. মাসিকের সময় নিয়মিত গোসল করা।

৪. মাসিকের কাপড় ও প্যান্টি ধোয়ার সময় সাবান ও ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা, স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে মাসিকের কাপড় ধোয়া।

৫. খোলামেলা জায়গায় যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস ও রোদ আসে এমন স্থানে মাসিকের কাপড় শুকাতে দিতে হবে।খাটের নিচে বা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় কাপড় শুকানো যাবে না। এতে করে জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।

৬. প্যাড বা কাপড় পরিবর্তনের আগে ও পরে ভালোভাবে হাত সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা যাতে সংক্রমণ প্রতিরোধ হয়।

৭. সাবান ছাড়া শুধু হাল্কা কুসুম গরম পানি দিয়ে যৌনাঙ্গ ধৌত করা উচিত। কারণ যোনির নিজস্ব নিষ্কাশন পদ্ধতি আছে সুতরাং ডিওডরেন্ট বা সাবান জাতীয় কিছু যোনির ভেতরে ব্যবহার করা উচিত নয়।

৮. মাসিকের সময় যৌনাঙ্গ সব সময় শুকনো রাখা দরকার, ভেজা থাকলে নানান জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।

মাসিকবান্ধব টয়লেট কেমন হওয়া উচিত

টয়লেট আছে তো পানি নেই, পানি আছে তো টয়লেটের দরজা নেই, দরজা আছে তো দরজার সিটকারি (লক) নেই। টয়লেট পানি দরজা লক সবই আছে তো পরিষ্কার নয়। এই হচ্ছে দেশে টয়লেটের বর্তমান অবস্থা। যেখানে দেশের টয়লেটের অবস্থা এই সেখানে নারীবান্ধব এবং মাসিক বান্ধব টয়লেট তো নেই বললেই চলে।

কিছু কিছু জায়গায় নারীদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা থাকলেও তা একেবারে ব্যবহারের অনুপযোগী। এতটাই অপরিষ্কার যে সেখানে কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। এ সমস্যা সরকারি হাসপাতালগুলোতে আরও ব্যাপক।

যেখানে একজন সুস্থ মানুষেরই ওই ধরনের টয়লেটে যাওয়া অসম্ভব সেখানে একটি নারীবান্ধব বা মাসিক বান্ধব টয়লেটের অবস্থা আরও করুণ। বর্তমান সময়ে একটি নারীবান্ধব টয়লেট কতটা প্রয়োজন তা আমারা উপলব্ধি করতে পারি। মাসিকের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাটা বেশ জরুরি। তার জন্য পরিষ্কার কাপড় বা প্যাড ব্যবহার করা, হাত ধোয়ার পাশাপাশি পরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার করা প্রয়োজন।

মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাবান্ধব টয়লেট বলতে এমন টয়লেট বোঝায় যাতে সাবান, পরিষ্কার ও নিরাপদ পানি এবং প্যাড ফেলার ঢাকনাযুক্ত ঝুড়ি-এর ব্যবস্থা থাকবে। আবার টয়লেটে দরজা বা ছাদ না থাকলে তা মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়। মেয়েরা এই রকম টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অস্বস্তিতে পড়ে। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি এই বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা দরকার। একটি মাসিকবান্ধব টয়লেটে নিচের বিষয়গুলো থাকা জরুরি-

১. পরিষ্কার ও নিরাপদ পানির উৎস

২. পানির অব্যাহত সরবরাহ

৩. সাবান

৪. ঢাকনাসহ ডাস্টবিন

৫. গোপনীয়তা নিশ্চিতকরণ

৬. নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ

একটি মাসিকবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে আমাদের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য অপরিসীম। কারণ আমাদের সবার সচেতনতাই এনে দিতে পারে একটি সুন্দর পরিবেশ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ। এক্ষেত্রে সমাজের প্রতিটি মানুষের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক ও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা জরুরি।

এছাড়া সরকারের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে মাসিক বিষয়টি অন্তর্ভুক্তি করেও এই সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়। অভিভাবক সমাবেশ করে সব বাবা-মাকে দিয়ে সচেতনতা তৈরি করা, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে ও ইমামদের দিয়ে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts