চীনের প্রভাব বারছে বিশ্বজুড়ে

বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যদেশের উপর হস্তক্ষেপবাদকে সবসময়ই প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। কিন্তু মায়ানমার ও জিম্বাবুয়ের মতো উত্তপ্ত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা গভীর করতে থাকার প্রেক্ষাপটে বেইজিং বৈশ্বিক ভূমিকা পালনে আগ্রহী হয়ে ওঠছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

চীনের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় ‘অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ না করার’ নীতিতে। এই নীতি প্রণীত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। তখন চীন ছিল অনেক দুর্বল দেশ।

অবশ্য বেইজিং এখনো ওই নীতি অনুসরণ করে বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম স্থায়ী সেনাবাহিনী এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ায় সে এখন একেবারেই ভিন্ন শক্তি।
পরিবর্তনটি অতি সম্প্রতি দৃশ্যমান হয়েছে মায়ানমার থেকে মুসলিম উদ্বাস্তুদের বাংলাদেশে প্রবেশের ফলে যে সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে চীনের অস্বাভাবিক কৌশলগত ভূমিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে।

মধ্যপ্রাচ্যেও চীন তার ভূমিকা জোরদার করেছে। উত্তেজনাপ্রবণ এই অঞ্চলের জটিলতা থেকে সে নিজেকে দূরে রাখলেও সম্প্রতি সিরিয়া নিয়ে আলোচনার আয়োজন করেছে, ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি সঙ্ঘাত নিসরনের উদ্যোগ নিয়েছে।

কিংস কলেজ, লন্ডনের লাউ চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক কেরি ব্রাউনের মতে, চীন আর ছোট্ট পিছিয়ে থাকা শক্তি না হওয়ায় বৈশ্বিক ঘটনাবলীতে আরো বড় দায়দায়িত্ব গ্রহণ করছে।

তিনি বলেন, কোনো হাতি নিজেকে ইঁদুর ভাববে, তা ধরে নেয়া যায় না।

বিশ্বজুড়ে চীনের অবস্থান বাড়ছে তার ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ প্রকল্পটি এশিয়া ও ইউরোপ জুড়ে বিস্তৃত। এটি আসলে রেল ও সমুদ্র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রাচীণ বাণিজ্য রুটগুলোরই নতুন করে গড়ে নেয়ার প্রয়াস।

বিদেশে চীনের স্বার্থ সম্প্রসারিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কিভাবে সেগুলো সুরক্ষিত রাখা হবে।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত মাসে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে তার শক্তি আরো সুসংহত করে দেশকে বৈশ্বিক পরাশক্তিতে পরিবর্তন করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।

চীনা রাজনৈতিক ভাষ্যকার চেন দাওইয়িন বলেন, শির ‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সমুন্নত করার’ ঘোষণার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের মতো করে তার সক্রিয় ভূমিকা আরো বাড়ানো।

চেন বলেন, চীন প্রকাশ্যভাবে তার হস্তক্ষেপ না করার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে না। তবে ধীরে ধীরে ওই অবস্থান থেকে সরে আসবে। হস্তক্ষেপ না করার নীতি পরিণত হতে পারে হস্তক্ষেপে নিরপেক্ষ থাকার নীতিতে।

তিনি বলেন, বিদেশে চীনের জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হলে সে তার বিনিয়োগ এবং নাগরিকদের রক্ষার জন্য সেনা পাঠাতে পারে।

বেইজিং ইতোমধ্যে তার সামরিক শক্তি দেখাতে শুরু করেছে, গত আগস্টে জিবুতিতে প্রথম সামরিক ঘাঁটি চালু করেছে, বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক সম্ভারপূর্ণ দ্বীপ গড়ে তুলছে।

এমনকি প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ না করলেও এবং অনৈতিক কোনো কাজে জড়িত নয় বলে দাবি করলেও চীন নিজেকে বিদেশে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া অবস্থায় দেখতে পাচ্ছে।

জিম্বাবুয়ের সেনাবাহিনী সে দেশের ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিন আগে দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল কনস্টানটাইন চিওয়েনগা বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন।

এতে করে গুজব রটেছে, জিম্বাবুয়ের সাম্প্রতিক ঘটনায় বেইজিংয়ের ভূমিকা ছিল।

রবার্ট মুগাবের সাথে চীনের দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক ছিল, দেশটিতে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে।

ব্রাউন বলেন, এ ধরনের গুজবের ব্যাপারে তিনি ‘সন্দিহান।’ তবে কোনো পরাশক্তির কোনো পক্ষ না নেয়া যে অসম্ভব, এসব গুজব সেটাই প্রমাণ করছে।

কম্বোডিয়ায় চীনের বিপুল প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ রয়েছে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট বিনিয়োগ ছিল ১১.২ বিলিয়ন ডলার।

দারিদ্র্য-পীড়িত দেশটির চীনের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এর প্রধানমন্ত্রী হুন সেনকে গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করার দিকে চালিত করেছে বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের সাউথইস্ট এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক ব্রায়ান আইলার।

তিনি বলেন, চীন যত দিন কম্বোডিয়ার অর্থনৈতিক লাগাম ধরে রাখবে, দেশটি ততদিন বিরোধী দলবিহীন স্বৈরতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিরাজ করবে।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর সামরিক অভিযান চালিয়ে বৈশ্বিক ক্ষোভের মুখে পড়েছে মায়ানমার। ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করেছে জাতিসংঘ।

কিন্তু তবুও দেশটি চীনা সমর্থন পেয়ে যাচ্ছে। রাখাইনে বন্দর, গ্যাস ও তেল অবকাঠামোতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে চীন।

গত মাসে সহিংসতা বন্ধের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে একটি প্রস্তাব বাদ দিতে হয়েছে চীনা বিরোধিতার কারণে।

সঙ্কট সমাধানে বেইজিং যুদ্ধবিরতি, উদ্বাস্তু প্রত্যাবর্তন ও দারিদ্র বিমোচন-সংবলিত তার নিজস্ব একটি প্রস্তাব পেশ করেছে।

ব্রাউন মায়ানমারকে আরেকটি নাম হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সবকিছুর সাথেই এখন চীনের একটি সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। সেটা জিম্বাবুয়ে, বার্মা, শ্রীলঙ্কা বা নিউজিল্যান্ড- যেখানেই হোক না কেন। এটা একটি নজিরবিহীন পরিবর্তন।

তিনি বলেন, হস্তক্ষেপ না করার ধারণাটি অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। এমনকি চীন যদি নিরপেক্ষ থাকার নীতিও গ্রহণ করে দূরে থাকে, তবুও সমস্যাই তাকে খুঁজে বের করবে।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts