জাপানে কেন এত ভূমিকম্প?

japan
Share Button

‘ভূমিকম্পের দেশ’ হিসেবে ইতিমধ্যেই পরিচিত জাপান। বারবার বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে দেশটি। ভূমিকম্প, ভূমিকম্প থেকে সৃষ্ট সুনামিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয় জাপানিদের। সর্বশেষ গত তিন দিনে কয়েকটি বড় বড় ভূমিকম্প ও শতাধিক আফটার শকে অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্পে ৯ জন নিহত হওয়ার দুদিনের কম সময়ের ব্যবধানে শনিবার ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে দুলে ওঠে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কাইশু। একটু বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলেই ২০১১ সালের আতঙ্ক চেপে ধরে। সেবার ৯ মাত্রার ভূমিকম্প-সুনামিতে তোহকুতে অন্তত ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। শনিবার জাপানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ জাপান মেটোরোলজিক্যাল এজেন্সি জানিয়েছিল, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ২৫২ বার ভূকম্পন হয়েছে দেশটিতে। কিন্তু জাপানে কেন এত ভূমিকম্প?

ভূ-তাত্ত্বিকদের মতে, জাপান প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত। বাংলায় যার অর্থ হয় ‘আগুনের গোলা’। ‘রিং অব ফায়ার’ এমন একটি কাল্পনিক বেল্ট যা ঘোড়ার খুর আকৃতির মতো প্রধানত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ঘিরে রেখেছে। রিং অব ফায়ারে যেসব অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সেগুলো পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ। এই রিং অব ফায়ারই ৯০ শতাংশ ভূমিকম্পের কারণ। ৪০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে ৪৫২টি আগ্নেয়গিরি রয়েছে, যা পৃথিবীপৃষ্ঠে অবস্থিত মোট আগ্নেয়গিরির ৭৫ শতাংশ। এশিয়ার জাপান, পলিনেশিয়ার টোঙ্গো, দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর এই রিং অব ফায়ারের অন্তর্ভুক্ত। তাই এসব অঞ্চলেই বেশি ভূমিকম্প হয়ে থাকে।

পৃথিবীর কাঠামো মোটামুটি তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রথমত, বহির্ভাগের লবণাক্ত ও কঠিন ভূত্বক (পুরুত্ব প্রায় ৩০ কিমি.), দ্বিতীয়ত এর নিচে ২৯০০ কিমি. পুরু এক ধরনের ঘন ও আঠালো অংশ আর তৃতীয়ত সাড়ে তিন হাজার ব্যাসের কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠ। দ্বিতীয় ভাগের ঘন ও আঠালো অংশের উপরিভাগ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বিভক্ত। এগুলোই হচ্ছে টেকটোনিক প্লেট। প্লেটগুলোর নাম- প্রশান্ত মহাসাগরীয়, ইউরেশীয়, আফ্রিকান, আটলান্টিক, উত্তর আমেরিকান, দক্ষিণ আমেরিকান ও ইন্দো-অস্ট্রেলিয়। টেকটোনিক প্লেটগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে ধাক্কা লাগলে বা সংঘর্ষ হলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। গত বছর নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণ ছিল ভারতীয় প্লেট (ইন্দো-অস্ট্রেলীয় প্লেটের অংশবিশেষ) ও ইউরোশীয় প্লেটের সংঘর্ষ। এই দুটো প্লেটের সংঘর্ষের ফলেই একসময় হিমালয় পর্বতের সৃষ্টি হয়েছিল। জাপানের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের ব্যাপারে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) জিওফিজিস্ট পল ক্যারুসো বলেন, এটি ফিলিপিন্স সাগরের প্লেট ও ইউরোপীয় প্লেটের সংঘর্ষের ফলে হয়েছে।

জাপানের ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর সুনামি-সতর্কতা জারি করা হয়। তবে পরে আবার তা প্রত্যাহার করা হয়। এবারের ভূমিকম্পে ‘সুনামি’ হবে না- বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে এটি নিশ্চিত হওয়ার পরেই ‘সতর্কতা’ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পল ক্যারুসো বলেন, ‘তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটলেই কেবল সুনামি ঘটে। প্রথমত, ভূমিকম্পটি কমপক্ষে ৭ মাত্রার হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হতে হবে সাগরের নিচে। আর তৃতীয়ত, ভূমিকম্প হতে হবে অগভীর (শ্যালো) স্থানে। ফিজিতে যে ভূমিকম্প হয়েছিল, তার উৎপত্তিস্থল ছিল ৪০০ মাইল (৬৪০ কিমি.) গভীরে। অতএব তাতে ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা নেই। জাপানের এই ভূমিকম্প ৭ মাত্রার এবং মাত্র ৬ মাইল গভীরে হলেও এর উৎপত্তিস্থল সাগরে নয়, ভূমিতে। তাই এই ভূমকম্পে সুনামি সংঘটিত হবে না। তবে অনেকগুলো আফটার শক ঘটবে।’ এই ভূ-তাত্ত্বিক সতর্ক করেন, ভূ-অভ্যন্তরে যেসব পরিবর্তন ঘটছে, তাতে আরও বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্য জাপানকে প্রস্তুত হবে। তবে সেটা ঠিক কখন এবং কীভাবে হবে- সে ব্যাপারে কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবে না। লাইভ সাইন্স।

 

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts