মিয়ানমারে মেয়েকে ধর্ষণে বাধা দেয়ায় মাকে জবাই

রোহিঙ্গা নির্যাতন
Share Button

ঝাঁকে ঝাঁকে গরু, মহিষ, ছাগল, ধানচাল, নগদ টাকা, বাড়ীঘর সবই ছিল। ছিল পুকুর ভরা মাছ, সহায় সম্পত্তি। মিয়ানমারের বর্মী সেনা পুলিশ ও রাখাইন যুবকেরা তান্ডব চালিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছে। সর্বস্ব হারিয়ে আজ পথের ফকির বনে গেছি। আমার চোখের সামনে যুবতী কন্যাকে ধর্ষণ করেছে। বাঁধা দিতে গিয়ে ২ ছেলেকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। কথা গুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মিয়ানমারের মংডু জাম্বুনিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দেস মাওলানা ছাবের আহমদ(৭০)। তিনি আরো বলেন, তার গ্রামে প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি ছিল।

এক রাতের আগুনে পুড়ে নিঃশেষ করে ফেলা হয়েছে সবকটি পরিবারকে, হত্যা, ধর্ষণ, গুলিবিদ্ধ করে আহত করা হয়েছে ওই গ্রামের যুবক-যুবতীদের। তাদের গ্রামের অনেকেই কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু এখানে রাত কাটানোর জায়গা নেই, খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে শিশু কিশোর ও বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষকে। শারমীন আরা (৯), ইয়াছির (০৭), ফরমিনা (৪) ও নইমারা (২) এ চার শিশু সন্তানকে বুকে আকড়ে ধরে খেয়ারীপ্রাং গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া ফিরোজা বেগম (২৮) কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, তার স্বামী আবুল ফয়েজ (৩৫) এক জন ব্যবসায়ী ছিলেন। খেয়ারীপ্রাং গ্রামের তার ছিল বড় একটি কাপড়ের দোকান।

রাতে দোকান থেকে বাড়ীর ফেরার পর পরই বর্মী সেনারা তাকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন শুনেছি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। পুরুষজন কেউ না থাকার কারণে তাকে ৪ ছেলে মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে। মংডু মিয়াজাইন্ন্যার ঘোনা থেকে আসা স্বামী হারা মরিয়ম খাতুন (৩২) জানায়, ১০/১২টি ঘর নিয়ে তাদের একটি গ্রাম। একটু নির্জন এলাকা হওয়ার কারণে এতদিন বর্মী সেনাদের চোখ পড়েনি ওই গ্রামের উপর। গত শনিবার সকালে ৭/৮ জন বর্মী সেনা পুলিশ ও রাখাইন যুবকের একটি দল তাদের গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়ী বাড়ী ঢুকে সহায় সম্পদ লুটপাট করে। যাওয়ার সময় তার স্বামী সলিম উল্লাহকে (৩২) ধরে নিয়ে যায়।

পুড়িয়ে দেওয়া হয় বসতবাড়িটি। একই গ্রামের তৈয়বা খাতুন (২৬) জানায়, বর্মী সেনারা তার স্বামী মৌলভী একরামকে চোখের সামনে জবাই করে হত্যা করে। পাশের বাড়ীর তাসমিন (২৬) জানায়, বর্মী সেনারা তার স্বামী আজিজুর রহমানকে পৈচাশিক মারধর করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া ঘরের মধ্যে নিক্ষেপ করে। প্রায় ৮ পরিবারের ৫০ সদস্যের অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে কুতুপালং বস্তির ২নং ব্লকের মোহাম্মদ আলীর ঝুঁপড়ি বাড়ীতে। সাংবাদিকদের স্বজন হারানো তথ্য দেওয়ার সময় অনেকেই হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা গেছে। মংডু হাতিরপাড়া গ্রামের জাফর হোছনের মেয়ে আসমা বেগম (১৬) জানায়, মগসেনারা তাদের বাড়ীতে ঢুকে বাবার অনুপস্থিতিতে তাকে ধর্ষণ করেছে। এসময় বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলে মা মনোয়ারা বেগম (৩০) কে বর্মী সেনারা তার চোখের সামনে নিমর্ম ভাবে জবাই করে হত্যা করে।

একমাত্র ছোট্ট বোনকে কোলে নিয়ে এপারে চলে এসেছি। আশ্রয় নিয়েছি কুতুপালং বস্তির এক আত্মীয় বাড়ীতে। আজ দুদিন ধরে আমি ও আমার বোনকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে এক কাপড়ে কোন রকম দিন কাটাতে হচ্ছে। খেয়ারীপ্রাং গ্রামের জয়নাব বিবি (২৫) জানায়, তার স্বামী ইউসুপ আলী ও আড়াই বছরের ছেলে সিরাজুল মোস্তফাকে বর্মী সেনারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। সে জানায়, তাদের ১৫ একর জমির ধান আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছে। লুটপাট করা হয়েছে প্রায় ৫০টি গরু, ছাগল, মহিষ। হাতে কিছু টাকা ছিল, তিন ছেলেকে বাচাঁতে মিয়ানমারের কুমিরখালী হয়ে উলুবনিয়া সীমান্ত দিয়ে ৪ দিন পায়ে হেঁটে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছি। মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ঘুরে ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভকে জানান, অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে বিজিবি, পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকার পরও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। এমতাবস্থায় এসব রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সামগ্রী দিয়ে সহযোগীতা করা হলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। তাই অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে এদেরকে যথাযথ খাদ্য ও মানবিক সেবা দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো প্রয়োজন বলে তিনি দাবী করেন। কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকার সাংবাদিকদের জানান, ১ ডিসেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুপ্রবেশকারী কোন রোহিঙ্গা আটক হয়নি। তবে ১ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৪৮২ জন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাকে আটক করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সীমান্তের আরো একাধিক পয়েন্টে বিজিবি’র নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts