মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিধনযজ্ঞ চলতে থাকার রহস্য

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিধনযজ্ঞ
Share Button

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দেশটির উগ্র বৌদ্ধদের নিধনযজ্ঞ ও দমন-পীড়ন এখনও চলছে। প্রশ্ন হল কেনো এই নিধনযজ্ঞ ও দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে?

মিয়ানমার একটি দরিদ্র দেশ। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান। মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভ করে ব্রিটেনের কাছ থেকে ১৯৪৮ সনে। দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামে স্থানীয় মুসলমানদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ব্রিটেনে অবস্থিত বৌদ্ধদের উপাসনালয় বিষয়ক ফেডারেশনও মিয়ানমারের মুসলিম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ নেতা অশিন ভিরাতুর সহিংস তৎপরতাগুলোকে সমর্থন দেয়ায় এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সুপরিকল্পিত গণহত্যায় পাশ্চাত্যের ইন্ধন রয়েছে। মিয়ানমারের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রাখার জন্য পাশ্চাত্য দেশটির মুসলমানদের ওপর যেন প্রতিশোধ নিচ্ছে।
মিয়ানমারের মুসলিম-বিদ্বেষী সবচেয়ে সহিংস গোষ্ঠী ‘নয়-ছয়-নয়’ চার বছর আগে ২০ জন রোহিঙ্গা মুসলিম ছাত্রকে মিথিলা বা মিকতিলা শহরে হত্যা করে। এই গোষ্ঠীর সদস্যরা ওই ছাত্রদের দেহকে কেটে টুকরো টুকরো করে কর্তিত অঙ্গে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

মিয়ানমারের তৎকালীন সংসদের অন্যতম সদস্য উইন হুতিন নয়-ছয়-নয় গোষ্ঠীর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ফাঁস করে বলেন, তার চোখের সামনেই ওই ছাত্রদের দেহ টুকরো টুকরো করা হয়েছিল। পুলিশ অশিন ভিরাতুর ওই গোষ্ঠীর এই পৈশাচিক নৃশংসতার সামনে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করায় উইন হুতিন সংসদে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, রাজনীতিবিদ ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় ১৯৬২ সনের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সাম্প্রতিক বহুদলীয় নির্বাচন পর্যন্ত সময়ে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা ভিক্ষুদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সামরিক শাসকদের শাসনকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে। আর তাই তারা উগ্র বৌদ্ধদের অপরাধযজ্ঞকে সব সময়ই দেখেও না দেখার ভান করেছে। অন্যদিকে প্রভাবশালী বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও সব সময় সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের কর্মসূচী ও নীতির সহযোগী করার চেষ্টা চালিয়েছে সব সময়ই। নয়-ছয়-নয় উগ্র গোষ্ঠীর প্রতি মিয়ানমারের সেনা-সমর্থিত সাবেক প্রেসিডেন্ট তিইন সিয়েনের সমর্থন ছিল তাদের ওইসব প্রচেষ্টারই ফসল।

অশিন ভিরাতুর উগ্র গোষ্ঠীর অপরাধযজ্ঞ সম্পর্কে নানা মহলের প্রতিবাদ ও নিন্দার জবাবে তিইন সিয়েন বলেছেন, ভিরাতু একজন অসাধারণ ব্যক্তি ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।

ভিরাতুর চিন্তাধারার বিরোধী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বলছেন, মিয়ানমারের সেনা-সমর্থিত সরকার ও সশস্ত্র-বাহিনীর সমর্থন না পেলে নয়-ছয়-নয় গোষ্ঠী কখনও রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের ওপর এমন অপরাধযজ্ঞ চালানোর ও তা অব্যাহত রাখার সাহস পেত না।
মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী সব সময়ই অপরাধযজ্ঞের পর সক্রিয় হয়। তারা হত্যাযজ্ঞে জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পরিবর্তে রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকেই তাদের ঘরবাড়ি ত্যাগে বাধ্য করে কথিত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়ার অজুহাত দেখিয়ে। অন্য কথায় এভাবেই রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে তাদের ঘড়-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং প্রাণে বেঁচে-যাওয়া রোহিঙ্গারা আশ্রয়-শিবিরে ও তাদের অনেকেই আশপাশের দেশে আশ্রয় নিচ্ছে। বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মত দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা। আর এইসব দেশের আশ্রয় শিবিরগুলো অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের জন্য বসবাসের উপযোগী নয়। (বাজনা)
মিয়ানমারের সেনা-সমর্থিত সরকার সব সময়ই দেশটির মুসলমানদের সম্পর্কে বিদ্বেষী ও ঘৃণা ছড়ানোর নীতি জোরদারের চেষ্টা করেছে। এ নীতির আওতায় মুসলমানদেরকে নতুন মসজিদ নির্মাণ ও পুরনো মসজিদ সংস্কারের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। সরকারের সহযোগিতা নিয়েই উগ্র বৌদ্ধরা মিয়ানমারের বহু মসজিদ ধ্বংস করেছে।

রোহিঙ্গা মুসলমানরা বলছেন, পশ্চিমারা ও মিয়ানমার সরকার সহিংসতার ঘটনাগুলোকে দু’পক্ষের সংঘর্ষ বলে প্রচার করলেও বাস্তবে উগ্র বৌদ্ধরাই মুসলমানদের ওপর একতরফাভাবে চড়াও হয়ে তাদের ওপর সহিংসতা চালিয়ে আসছে। উগ্র বৌদ্ধরা হিজাব বা ইসলামী পোশাকের মধ্যে বা দেয়াল-লিখনের মধ্যে ইসলামের চিহ্ন বা গন্ধ পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং তাদের ঘড়-বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।

অনেকেই বলছেন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিধনযজ্ঞের ঘটনাগুলোর সঙ্গে চীনের সিনকিয়াঙ্গের মুসলমানদের ওপর চীনা বৌদ্ধদের ও সরকারি নিপীড়নের সম্পর্ক বা সমন্বয় রয়েছে। বেইজিং মনে করে চীনের উইঘর মুসলমানদের কোনো কোনো গ্রুপ রোহিঙ্গা মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। সম্ভবত উইঘর মুসলমানরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা নিয়ে তাদের অবস্থা শক্তিশালী করতে চায়। তাই চীনের সিনকিয়াঙ্গের মুসলমানদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের যোগাযোগের সম্ভাবনা দূর করাও তাদের ওপর নিধনযজ্ঞ পরিচালনার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন। একইভাবে মনে করা হয় যে ভারত সরকারও রোহিঙ্গাদেরকে এই ভেবে ভয় পাচ্ছে যে তারা শ্রীলংকার তামিলদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ভারতের তামিলনাড়ুতেও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন উস্কে দিতে পারে। ভারত সরকার সব সময়ই শ্রীলংকার তামিলদের ওপর বৌদ্ধ সিংহলিদের দমন অভিযানকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। অন্যদিকে চীনও রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিধনযজ্ঞ ও নানা দেশে তাদের ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে কখনও উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে বাঙ্গালী বলে দাবি করে দেশটির সরকার। আর এই অজুহাত দেখিয়ে তাদেরকে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে মিয়ানমার সরকার। মিয়ানমার সরকারের ওপর প্রভাব ফেলার কোনো মাধ্যম বা হাতিয়ারই নেই রোহিঙ্গাদের কাছে যাতে উগ্র বৌদ্ধদের অপরাধযজ্ঞ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। কিন্তু উগ্র বৌদ্ধ বর্ণবাদী গোষ্ঠী ‘নয়-ছয়-নয়’ মিয়ানমার এবং পশ্চিমা সরকারগুলোর পক্ষ থেকে তাদের রোহিঙ্গা-বিরোধী অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রকাশ্যে ও গোপনে সহায়তা বা উৎসাহ পাচ্ছে।
পাশ্চাত্যের টাইম ম্যাগাজিনে ওশিন ভিরাতুর ছবি ছাপা হয়েছে। এই ম্যাগাজিনে তাকে একজন বৌদ্ধ সন্ত্রাসী নেতা বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও পশ্চিমা সরকারগুলো এখনও তার নয়-ছয়-নয় গোষ্ঠীটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তালিকায় যুক্ত করেনি। বরং ব্রিটেনের বৌদ্ধ মন্দির কর্তৃপক্ষ ভিরাতুকে ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে পুরস্কার দিয়েছে এবং রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিধনযজ্ঞ পরিচালনার পুরস্কার হিসেবে পদক দিয়ে তাকে সম্মান জানিয়েছে ও তার প্রশংসা করেছে। মিয়ানমারের সাবেক প্রেসিডেন্ট তিইন সিয়েন তো ভিরাতুকে নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন।
বর্তমানে মিয়ানমারের ক্ষমতায় রয়েছেন অং সান সুচি। তার শাসনামলে রোহিঙ্গাদের ওপর নিধনযজ্ঞ বন্ধ হবে বলে অনেকেই আশা করছিলেন। মুসলমানরা এক বুক আশা নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সুচির আন্দোলনে তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু সুচি উগ্র বৌদ্ধ ভিক্ষু নেতাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চান না। তাই রোহিঙ্গাদের ওপর নিধন ও নিপীড়ন আগের মতই অব্যাহত রয়েছে।
সুচি রোহিঙ্গাদেরকে রাখাইন প্রদেশের মুসলমান বলে অভিহিত করতে চেয়েছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু উগ্র বৌদ্ধরা এর বিরোধিতা করেছে। তারা মনে করে এর ফলে রাখাইনে মুসলমানরা বৈধতার স্বীকৃতি পাবে। উগ্র বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে বাঙ্গালী মুহাজির বলে অভিহিত করার দাবিতে বেশ কয়েকবার বিক্ষোভ মিছিলও করেছে।
রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিধনযজ্ঞ বন্ধ করার জন্য উগ্র বৌদ্ধ গোষ্ঠীগুলোকে বিশ্ব-সমাজের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বলে ঘোষণা করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ জোরদার করতে হবে বলে রোহিঙ্গারা মনে করেন। ভারত ও শ্রীলংকা সরকারকেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে বলে তারা মনে করছেন। একইসঙ্গে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি এবং মুসলিম সরকারগুলোকেও রোহিঙ্গাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে বলে রোহিঙ্গা মুসলমানরা আশা করছেন। #

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts