হাসিনাকে সঙ্গে পেতে মমতাকে কাঁদিয়ে ছাড়বেন মোদী!

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে একি বললেন মোদি!
Share Button

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পরিকল্পনা, তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করবেন এবং ঢাকার প্রস্তাব মোতাবেক গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পের কিছুটা ব্যয়ভার বহন করবেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দু’টি পরিকল্পনারই বিরোধিতা করেছেন এই মর্মে যে, এই দুই পরিকল্পনাই তাঁর রাজ্যের স্বার্থের পরিপন্থী।

বিজেপি শীর্ষ সূত্র থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী মোদী পাঁচ রাজ্যে ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। ভোটে জিততে পারলে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজয়ী হলে মোদী তাঁর বিরোধীদের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার উপযোগী মনোবল পাবেন, সেই সঙ্গে রাজ্যসভায় বিজেপি-র অবস্থানও সুদৃঢ় হবে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি নেওয়ার ব্যাপারটা দলের স্বপক্ষেই যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, জল-ইস্যুতে মমতা বেগড়বাঁই করলে মোদী তাঁকে একহাত নেবেন। কারণ ভারত এই মুহূর্তে তিস্তা জলবণ্টন আর বাংলাদেশের রাজবাড়ি এলাকায় পদ্মা-নিম্ন অববাহিকায় প্রস্তাবিত ব্যারেজ নির্মাণের ব্যয় বহন করতে বিশেষভাবে আগ্রহী।

কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রকের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘আমাদের দক্ষ নদীসম্পদ বিশেষজ্ঞরা এই মত দৃঢ়ভাবে পোষণ করেন যে, দুই ক্ষেত্রেই ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ পূর্ণমাত্রায় রক্ষিত হবে।’  মোদী ও তাঁর দল মনে করছে, মমতার এই বিরোধিতা শুধুমাত্র কেন্দ্রকে অপদস্থ করার কারণেই। তছাড়া নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু উদ্বেগও এই বিরোধিতার পিছনে থাকতে পারে।

এই চুক্তিগুলি না হলে এপ্রিলে যখন শেখ হাসিনা দিল্লি সফরে আসবেন, তখন বাংলাদেশে তাঁর সম্মান ধুলোয় লুটোবে। ভারতকে একেবারে ফ্রিহ্যান্ড দিয়ে বদলে কিছুই না পাওয়ার মাশুল তাঁকে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ। আর জল কৃষির জন্য একান্ত জরুরি। সে কারণে জল-ইস্যুকে অবহেলা করাটা মোটেই সঙ্গত নয়। ভোটে জেতার জন্য জল-প্রসঙ্গকে হাসিনা সহ কেউই হেলাফেলা করতে পারেন না।

মোদীর দিক থেকে দেখলে, হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ায় তাঁর সবথেকে বিশ্বস্ত মিত্র। হাসিনা শুধুমাত্র উত্তরপূর্বের জঙ্গিদের বাংলাদেশি ঘাঁটিগুলিকে গুঁড়িয়ে দেননি, তিনি উত্তরপূর্ব ভারত থেকে পণ্য সংবহনের ব্যাপারেও সাহায্য করেছেন। চট্টগ্রাম অথবা মঙ্গলা বন্দরের অভিমুখ তাঁর সক্রিয়তাতেই সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি মোদীর ডাকে সাড়া দিয়ে সার্ক সম্মেলনে পাক-বিরোধিতা করে ইসলামাবাদ বয়কটে সামিল হয়েছিলেন।

মোদীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বাংলাদেশের সঙ্গে একটা দীর্ঘমেয়াদী সেনা সহযোগিতা-চুক্তি রূপায়ণে আগ্রহী। কিন্তু হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি এই মুহূর্তে একটি মউ ছাড়া অন্যে কোনও চুক্তি স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত নন। দিল্লিতে অনেকেই মনে করেন, হাসিনা নিজেকে দিল্লির ক্রীড়নক হিসেবে দেখাতে রাজি নন। দিল্লির সুরে নাচেন— এমন ইমেজ তাঁর একান্ত না-পসন্দ। অন্তত তিস্তা জলবণ্টন আর গঙ্গা ব্যারেজের হেস্তনেস্ত না হওয়া পর্যন্ত এই ইমেজ তাঁকে রক্ষা করতেই হবে।

অন্যদিকে, এই সেনা-সহযোগিতার বিষয়টিই বাংলাদেশকে চিনের দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে টেনে আনতে পারে। চিনের কাছ থেকে বাংলাদেশ অস্ত্র-সংক্রান্ত অনেক কিছুই এই মুহূর্তে আশা করছে। ইতিমধ্যেই দু’টি চিনা সাবমেরিন বাংলাদেশ কিনেছে। এতে দিল্লির টনক কিছু কম নড়েনি। বাংলাদেশে বন্ধু সরকার মানে, উত্তরপূর্বের জঙ্গি দমনে সহায়তার আশ্বাস, পূর্বভারতে আইএসআই-সহ অন্য পাক তৎপরতার প্রতিও নজরদারির আশ্বাস, উত্তরপূর্বের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহায়তার আশ্বাস।

দোভালের মতো কট্টরপন্থী মনে করেন মমতার জলচুক্তি-বিরোধিতা বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী শক্তিগুলিকে পরোক্ষে মদত দেবে, হাসিনাও এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে লাভবান হবে পাকিস্তান। কারণ হাসিনাকে নিয়ে পাকিস্তানের অশান্তি কিছু কম নয়। বাংলাদেশে সন্ত্রাস-বিরোধিতা এবং অসম ও উত্তর-পূর্বে জঙ্গি বিরোধিতাকে মাথায় রাখলে পশ্চিমবঙ্গ একটা সমস্যা বটে!

এই সব হিসেব-নিকেশ মাথায় রেখে মমতাকে আর একবার বোঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে জলচুক্তির গুরুত্ব। কিন্তু যদি মমতা তাতেও না-বোঝেন, যদি বিরোধিতাই চালিয়ে যান মোদীকে কোনো না কোনো ভাবে অগ্রসর হতে হবেই।

উত্তর প্রদেশে ভোটে জিতলে নোট বাতিলের সমালোচনা থেকে তিনি বেরতে পারবেন। কিন্তু তার পরেও যদি তৃণমূল গণ আন্দোলনের পথে যায়, তা হলে ঘটনা রাষ্ট্রপতি শাসনের দিকেও গড়াতে পারে। রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর উপরে তেমন কোনও নির্দেশনা কি নেই?

 

পশ্চিমবঙ্গের ভারপ্রাপ্ত বিজেপি সাধারণ সম্পাদক কৈলাস বিজয়বর্গীয় এমন একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেফতারের পরে তৃণমূলের আন্দোলনের সময়ে। তিনি কেবল মমতাকেই বাংলার বাইরে তাঁর ভাবমূর্তির ব্যাপারে সাবধান করে দেননি, রাজ্যে গণ্ডগোল দেখা দিলে রাষ্ট্রপতি শাসনের কথাও বলেছিলেন।

জনৈক বিজেপি শীর্ষনেতা, যিনি এখন উত্তরপূর্বের এক রাজ্যপালও বটে, আমাকে সম্প্রতি জানিয়েছেন, ‘মোদী মনমোহনের মতো দুর্বল নেতা নন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে মান্যতা দিয়ে মমতাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু মমতা গোঁয়ার্তুমি বজায় রাখলে মোদীও সুর বদলাবেন। এতে পশ্চিমবঙ্গ হয়তো মোদী-বিরোধী হবে। কিন্তু বাংলাদেশ এতে কৃতজ্ঞ থাকবে। বাংলাদেশে বন্ধু সরকার, বিরোধী মমতার চাইতে অনেক বেশি জরুরি ব্যাপার।’

এই নেতা (যাঁর নাম আমি করতে পারছি না) বলেছেন, কংগ্রেস অথবা বাম— কেউই সোদীকে এই চুক্তিগুলি সম্পাদনের বিরোধিতা করবে না। কারণ, ২০১০ সালে মনমোহন যখন তিস্তা চুক্তি সই করতে চেয়েছিলেন, তখন এঁরা দারুণ ভাবে তাঁকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

তিস্তা আর গঙ্গা ব্যারেজ চুক্তি সর্বোপরি মোদিকে নোট বাতিলের ফলে সৃষ্ট বিরোধিতার জবাব তৈরি করতে সাহাষ্য করবে, সন্দেহ নেই।

-সুবীর ভৌমিক

(সুবীর ভৌমিক একজন ভারতীয় চিন্তাবিদ এবং গবেষক। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্‌স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এ কর্মরত। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের সংবাদদাতা হিসেবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন এলিজাবেথ হাউস ফেলো তিনি।)

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts