দেড় লাখ গাড়িতে ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার

Gas cylinder risk -www.bdlatest24.com+Bangladesh.jpg
Share Button

গাড়িতে মেয়াদ উত্তীর্ণ সিলিন্ডার বোমার চেয়েও ভয়াবহ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আর গ্যাসের সিলিন্ডারটি নিয়মিত পরীক্ষা না করার ফলে নানা দুর্ঘটনা বয়ে আনতে পারে। এক্ষেত্রে কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়িগুলোর গ্যাস সিলিন্ডারের পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা অন্যান্য যানবাহনের সিলিন্ডারের পরীক্ষার রেওয়াজ তেমন একটা নেই। এজন্য যেকোনো সময় ভয়াবহ ঘটনা ঘটার আশংকা রয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা-রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে সিএনজিচালিত যানবাহন প্রায় সোয়া দুই লাখ। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি অর্থাৎ মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। যার ৮০ ভাগই পুনঃপরীক্ষা হয়নি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী গত তিন বছরে প্রায় ১৫০টি গাড়িতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্যাস সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ কিনা তা পরীক্ষা করা হয় প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে (কনভার্সেশন সেন্টার)। সারা দেশে এমন ৫৮৭টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রিটেস্ট সেন্টার আছে মাত্র ১৩-১৪টি। এ প্রসঙ্গে বিস্ফোরক অধিদফতরের প্রধান পরিদর্শক সামসুল আলম বলেন, ‘মেয়াদ উত্তীর্ণ এক একটি সিলিন্ডার একটি বোমার চেয়েও ভয়াবহ।
তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার সময় গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেয়ার জন্য আমরা দুই বছর আগেই মন্ত্রণালয়কে লিখেছি। বিষয়টি তারাও আন্তরিকভাবে নিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হল দেশে মাত্র ১৩-১৪টি রিটেস্ট (পুনঃপরীক্ষা) সেন্টার দিয়ে সব গাড়ির সিলিন্ডার পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। এ কারণে তখন আইনের মধ্যে বিষয়টি সংযুক্ত করা হয়নি।’

সূত্র জানায়, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩ হাজার পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস দেয়া হয় তখন রাস্তায় চলাচলকারী এক একটি গাড়ি যেন চলমান বোমা হয়ে ওঠে। গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার এমনকি গ্যাসও উত্তপ্ত অবস্থায় থাকে। সিলিন্ডার যথাযথ না হলে বড় রকমের অঘটন ও প্রাণহানি ঘটতে পারে। বড় বাস-ট্রাকের বিস্ফোরণের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ বাস-ট্রাকগুলোতে ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার থাকে।

এ ব্যাপারে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, একটি সিলিন্ডারের মেয়াদ ৫ বছর। এরপর সেটি টেস্ট করা হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত করার কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। যারা গাড়ি ব্যবহার করে তারাও নিজ উদ্যোগে সেটি রিটেস্ট করেন না। গাড়িচালক ও ব্যবহারকারী নিজেই জানেন না যে, তার গাড়িটি বিপজ্জনক বোমা হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা যেমন নেই, তেমনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর পক্ষে চাপও নেই। এক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ছোট ছোট তথ্যচিত্র তৈরি করে প্রচার করা যেতে পারে। কিন্তু কেউ তা করছে না। তিনি আরও বলেন, কারা এসব গ্যাস সিলিন্ডার আমদানি করছে, কারা গাড়িতে সংযোজন করছে, সেটা মানসম্মত কিনা তা দেখার কেউ নেই। তিনি বলেন, গাড়ির রুট পারমিট ও ফিটনেসের ক্ষেত্রে গ্যাস সিলিন্ডারের রিটেস্টিং করা হয়েছে কিনা তার জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে বিআরটিএ এ বিষয়ে তেমন কার্যকর কিছু করতে পারছে না। এজন্য আইনেরও সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিচার্স ইন্সটিটিউটের (এআরআই) ডাটা স্পেশালিস্ট জাকারিয়া ইসলাম  বলেন,গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রাণহানি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে সিলিন্ডার নিয়মিত চেক করা। কেউ প্রথম সিলেন্ডার সংযোজনের পর তিনি চাইলে বুয়েট থেকে সেটি পরীক্ষা করে নিতে পারেন। সঠিক সিলিন্ডার লাগানো হলো কিনা তার দায়িত্ব পুলিশ ও বিআরটিএর। আমরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছে, এ বিষয়ে গাড়িচালক মালিকদের বাধ্য করার জন্য কোনো আইন নেই। ফলে তারা সেটা করতে পারছেন না। তিনি বলেন, গাড়িতে গ্যাস নেয়ার সময় ভেতরে অবস্থান করা উচিত নয়। এতে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. নুরুল ইসলাম  বলেন,কোনো গাড়ি ফিটনেস পাওয়ার জন্য বিআরটিএ সরকারের বিধিবদ্ধ কিছু আইন অনুসরণ করে। সেখানে গাড়িটি ডিজেল না পেট্রলচালিত সেটা উল্লেখ থাকে। গ্যাসচালিত বিষয়টি গাড়িতে উল্লেখ থাকে না। প্রথমদিকে কিছু সরকারি গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার সংযোজন করা হয়। এটা যখন সাশ্রয়ী প্রমাণিত হয় তখন সাধারণ মানুষও গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার সংযোগ শুরু করে।

 

ভয়াবহতার কিছু আলামত : বাংলা নববর্ষের দিন বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় আশুলিয়ার ডেলটা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেয়ার সময় একটি গাড়ির সিলিন্ডার বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। গাড়িটি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে এর যন্ত্রাংশ এবং ফিলিং স্টেশনের কিছু অংশ তুলার মতো উড়ে যায়। এ ঘটনায় দু’জন নিহত ও তিনজন আহত হন।

দু’দিন আগে চট্টগ্রামে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে চুরমার হয় ২টি গাড়ি ও গুরুতরও আহত হন তিনজন। এমন দুর্ঘটনা প্রায় সময় ঘটছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিুমানের সিলিন্ডার ব্যবহার করার কারণেই মূলত ঘটনাগুলো ঘটছে। এসব সিলিন্ডারযুক্ত প্রতিটি গাড়ি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, সারা দেশে প্রায় দেড় লাখেরও বেশি যানবাহন ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে রাস্তায় চলাচল করছে। এর একেকটি শক্তিশালী বোমার মতো হয়ে আছে। এর যে কোনোটিতে যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে ২০০টির বেশি সিএনজি কনভার্শন সেন্টারের অনুমতি দেয়া হয়। তারা কয়েক লাখ গাড়িতে সিলিন্ডার সংযোজন করেছে। গ্যাস সিলিন্ডার লাগানোর পর সেটি সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা; তার থেকে কোনো ঝুঁকি আছে কিনা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতর সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে গাড়িতে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার থেকে মানুষের জানমালের ঝুঁকি বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আইন পরিবর্তন হবে কিনা সেটা সরকারের পলিসিগত বিষয়। সিএনজিচালিত গাড়ির ফিটনেস নেয়ার সময় সেটির সিলিন্ডার রিটেস্টিং রিপোর্ট জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলে এবং এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা থাকলে বিআরটিএ সেটা কার্যকর করতে পারে। কিন্তু যতদিন কোনো অধ্যাদেশ বা আইন হচ্ছে না, ততদিন বিআরটিএর কিছু করার নেই।’

 

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts