নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা, সারাদেশে নিহত ৯

সহিংসতায় সারাদেশে নিহত ৯

প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম ধাপে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় সারাদেশে এক নারীসহ ৯ জন নিহত হয়েছেন।

মঙ্গলবার পিরোজপুর, নেত্রকোণা, সিরাজগঞ্জ ও কক্সবাজার জেলায় ভোটগ্রহণ শেষে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পিরোজপুরে পাঁচজন, কক্সবাজারে দুইজন এবং সিরাজগঞ্জ ও নেত্রকোনায় একজন করে নিহত হন।

প্রথম ধাপের এ নির্বাচনে ৭১২টি ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ শুরু হয় মঙ্গলবার সকাল ৮টায় এবং বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বিকেল ৪টায়। ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয় ৫৬টি কেন্দ্রে। নিজস্ব সংবাদদাতা ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে এসব তথ্য জানা গেছে।

পিরোজপুর :

জেলার মঠবাড়িয়ায় ধানীসাফা ইউনিয়নের একটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে ছয়জনের নিহতের তথ্য পাওয়া গেলেও পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাঁচজনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে।

নিহতদের মধ্যে তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। অন্য দুই জন হাসপাতালে মারা যান। নিহতরা হলেন, শাহাদত (৩০), সোহেল (২৫), বেলাল (৩০), সোলায়মান (২০) ও কামরুল মৃধা (২৫)। এছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন।

মোতাহের নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী জাগো নিউজকে বলেন, মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানীসাফা ইউনিয়নের সাফা কলেজ কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ফলাফল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু ওই কেন্দ্রের আওয়ামী লীগ প্রার্থী পরাজিত হতে যাচ্ছেন বলে গোপন সূত্রে খবর পান। এ খবর শোনার পর তার সমর্থকরা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সমর্থকদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও তারা শ্লোগান দিতে থাকেন এবং ইট-পাটকেল ছুড়েন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলেই তিনজন মারা যান। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান আরো দুজন।

কক্সবাজার :

জেলার টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দুটি কেন্দ্রে পৃথক সংঘর্ষের ঘটনায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর ভাইসহ দুজন নিহত হয়েছেন। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত ১০ জন।

নিহতরা হলেন, সাবরাং ইউনিয়নে আ.লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নুর হোসেন মেম্বারের সহোদর আবদুল গফুর (২৯) ও শাহপরীরদ্বীপ মাঝের পাড়ার দুদু মিয়ার ছেলে শফিক (২৪)।

টেকনাফ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মজিদ বলেন, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে সাবরাং ইউনিয়নের মাঝের পাড়া কেন্দ্র ও মুন্ডার ডেইল কেন্দ্রে পৃথক এ ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, মুন্ডার ডেইল কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালেট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে একদল দুর্বৃত্ত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গুলিবর্ষণ করে। এতে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক আতাউর রহমান জানান, মুন্ডার ডেইলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় হাসপাতালে ৫ জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আনা হয়। এর মধ্যে আব্দুল গফুরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হলে পথেই তার মৃত্যু হয়। নিহত আব্দুল গফুর (৩৫) আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নুর হোসেনের ভাই।

অপর দিকে ভোটের ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সাবরাং এর মাঝের পাড়া কেন্দ্রে ইউপি সদস্য প্রার্থী নুরুল আমিন ও মোহাম্মদ সেলিমের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে অল্প কিছু ভোটের ব্যবধানে প্রথমে নুরুল আমিনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত এ ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেন অপর প্রার্থী মো. সেলিম। এর প্রেক্ষিতে ভোট পুনঃগণনা করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গণনা শেষে সেলিমকে বিজয়ী ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এসময় গুলি চালায় উভয়পক্ষের সমর্থকরা। এক পর্যায়ে উভয়পক্ষের লোকজন ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গুলিবর্ষণ করেন।

এতে নিহত হয়েছেন শাহপরীরদ্বীপ মাঝের পাড়া এলাকার দুদু মিয়া বলির ছেলে শফিউল আলম (৩০)। তবে কোন পক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি নিহত হয়েছেন তা জানাতে পারেননি ওসি। এ ঘটনার পর থেকে এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সিরাজগঞ্জ :

জেলার রায়গঞ্জে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর পরাজিত সদস্যের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নোনাই বেগম (৫৫) নামে এক নারী নিহত হয়েছেন। এসময় অন্তত আরো ১০ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের জয়ানপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত নোনাই বেগম উপজেলার জয়েনপুর গ্রামের ইনসাব আলীর স্ত্রী।

৯নং ওয়ার্ডের বিজয়ী ইউপি সদস্য নবাব আলী অভিযোগ করে বলেন, সিলিং ফ্যান প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সামিদুল ইসলাম (ফুটবল) পরাজয় মেনে না নিয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার কর্মী-সমর্থক ও আত্মীয়-স্বজনের উপর হামলা চালায়। হামলাকারীদের লাঠির আঘাতে ঘটনাস্থলেই শাশুড়ি নোনাই বেগম মারা যান ও আহত হয় আরো ১০ জন।

রায়গঞ্জ সার্কেলের এএসপি মোতাহার হোসেন জানান, জয়ানপুর এলাকায় বিজয়ী ও পরাজিত ইউপি সদস্যের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ও র্যাুব সদস্যদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।

নেত্রকোনা :

নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার ৩নং খালিয়াজুরী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর ছোট ভাই গোলাম কাওসার (৩০) নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খালিয়াজুরি ইউনিয়নের আধাউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় বিশৃঙ্খলা শুরু হলে অতর্কিত গুলিতে কাউসার গুরুতর আহত হন। পরে তাকে খালিয়াজুরি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে কে বা কারা গুলি ছুঁড়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার (এসপি) জয়দেব চৌধুরী জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। অপরদিকে খালিয়াজুরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts

Leave a Comment