যেভাবে খুন করা হয় বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে

চট্টগ্রামে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা
Share Button

পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতুকে (৩২) হত্যার পরিকল্পনা একেবারেই পরিকল্পিত বলেই ধারণা করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। মিতুকে পাঠানো এক এসএমএস’র সূত্রের সন্ধানেও নেমেছেন তারা। যে এসএমএস’র মাধ্যমেই সকাল সকাল বাসা থেকে বের করে আনা হয় বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে।

জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল ৮টায় শুরু হয় ছেলে মাহি আক্তারের স্কুল। কিন্তু শনিবার এক এসএমএস সূত্রে মা মিতু জানতে পারেন রোববার থেকে স্কুলে অ্যাসেম্বলি হবে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা আগে ছেলে মাহির আক্তারকে নিয়ে জিইসি এলাকার ফ্ল্যাট থেকে বের হয়েছিলেন তিনি।

পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের প্রতিবেশি ও পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী সিনথিয়া আখতার বলেন, ‘মাহির আক্তার নগরীর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওই স্কুলে আমার ছেলেও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আগে স্কুল শুরুর সময় সকাল ৮টা হলেও শনিবার রাতে ভাবি আমাকে ফোন করে জানান তাকে স্কুল থেকে এসএমএস পাঠানো হয়েছে। রোববারে স্কুলে অ্যাসেম্বলি হবে। তাই মাহিরকে ৭টা ২০ মিনিটে স্কুলে পৌঁছাতে হবে। স্কুলের গাড়িও একটু এগিয়ে সকাল ৬টা ৫০ এর দিকে জিইসি’র মেরিডিয়ান রেস্টুরেন্টের সামনে আসবে। তাই ভাবি ছেলেকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসতে ৬টা ৪০ এর দিকে বাসা থেকে বের হন।’

এদিকে হত্যাকারীরা নিতুর গতিবিধিতে আগেই নজর রেখেছিল। প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, কোথা থেকে এসেছিল সেই এসএমএস? দুর্বৃত্তরাই বা কীভাবে জানতে পারলো আগেভাগে বেরুনোর সে তথ্য?

স্কুল থেকে এমন কোনো এসএমএস পাঠানো হয়েছিল কি না তা জানতে যোগাযোগ করা হলে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের স্কুল শাখার উপাধ্যক্ষ সৌমিত কুমার বলেন, ‘প্রতিদিন নিয়মিত সময়েই স্কুল শুরু হয়। আজ আগেভাগে স্কুল শুরু হবে এমন নির্দেশনা দিয়ে স্কুল থেকে কোনো এসএমএস পাঠানো হয়নি।’

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) পরিতোষ ঘোষ বলেন, ‘দুর্বৃত্তরা আগে থেকেই ঘটনাস্থল রেকি করেছিল। ঘটনাস্থল থেকে ১০০ গজ দূরে বাসা থেকে বের হয়ে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে মিতু কখন আসবেন, তা নিশ্চয়ই দুর্বৃত্তরা আগে থেকে খোঁজখবর রাখছিল।’

ঘটনাস্থলে থাকা পিবিআই চট্টগ্রাম প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বশির আহমেদ খান জানান, সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটের দিকে বাসা থেকে ১০০ গজ দূরে ছেলেকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে যাওয়ার পথে তিনজন মোটরসাইকেল আরোহী বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে প্রথমে ধাক্কা দেয়। এরপর তারা ছুরিকাঘাত করে পরপর তিন রাউন্ড গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে তিনটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। ছুরিকাঘাতের পাশাপাশি মাহমুদা আক্তারের মাথার বাম পাশ গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

তিনি আরো জানান, এই হত্যাকাণ্ডের ধরন জঙ্গিদের দ্বারা সংঘটিত আগের হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে মিল আছে। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। খুনিদের ধরতে অভিযান চলছে।

সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের সামনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. কবির জানান, মাথার বাম ও ডান পাশে আঘাত করা হয়েছে ছুরি দিয়ে। বুকের মাঝখানে, কাঁধে, হাতের কনুই ও পিঠের মাঝখানেও রয়েছে বড় ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। এরকম ৮টি ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে পুরো শরীরেজুড়ে। এছাড়া মাথার বামপাশে করা হয়েছে গুলিও। শুধুমাত্র মৃত্যু নিশ্চিতে পুলিশের এসপি বাবুলের আক্তারের স্ত্রীকে এভাবে আঘাত করে খুন করে চলে যায় দুর্বৃত্তরা।

তিনি বলেন, ‘মাহমুদা খানম মিতুর শরীরে ১০টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মাথার বাঁ পাশে গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। এছাড়া মাথার ডান পাশে পাওয়া গেছে ইটের আঘাত। ইটের আঘাতটি হয়তো মাটিতে পড়ে যাওয়ার সময় পেয়েছেন। এছাড়া বুকে, পিঠে ও হাতে ধারালো অস্ত্রের আটটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এর মধ্যে পিটে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের ফলে ইংরেজি ‘এল’ আকৃতির মতো হয়ে পড়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে অব্যবহৃত তিনটি বুলেট উদ্ধার করা হয়। এগুলো ৭.৬৫ বোর পিস্তলের গুলি হতে পারে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকারীরা খুব কাছ থেকে গুলি করেছে।’

এদিকে ঘটনার পরপর সিআইডি, ডিবি, সিবিআই ও পুলিশ বিষয়টি তদন্তে মাঠে নেমেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার। এসময় তিনি হত্যাকাণ্ডের সাথে জেএমবি জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান।

উল্লেখ্য, এসপি বাবুল আক্তার গত বৃহস্পতিবার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল সিএমপি ছেড়ে পুলিশ সদর দপ্তরে যোগদানের জন্য বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তিনি চট্টগ্রামে জেএমবির সামরিক প্রধান জাবেদসহ বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দেশে নতুন করে জঙ্গিবাদের উত্থানটি আবিষ্কার করেছিলেন।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts