সংলাপে কেন সমাধান পায়নি ঐক্যফ্রন্ট?

সংলাপ

সরকারি দল ও জোটের সঙ্গে সংলাপে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের সাংবিধানিক বিকল্প প্রস্তাবসহ সাত দফা নিয়ে আলোচনা হলেও ‘বিশেষ কোনো সমাধান’ পায়নি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তবে সভা-সমাবেশে বাধা থাকবে না বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশ্বাস দিয়েছেন।

সংলাপ শেষে বাসায় ফিরে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা গণভবনে গিয়েছিলাম, তিন ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। নেতৃবৃন্দ তাঁদের অভিযোগের কথাও বলেছেন, সরকারের ব্যাপারে তাঁদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। সবার কথা শোনার পর প্রধানমন্ত্রী লম্বা বক্তৃতা দিলেন। কিন্তু আমরা ওখানে কোনো বিশেষ সমাধান পাইনি।’ এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমরা সন্তুষ্ট নই।’

সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এই সংলাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারি দল ও জোটের ২৩ জন নেতা-মন্ত্রী এবং ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ২০ জন নেতা অংশ নেন।

পরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন হয় না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। সেখানে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সরকার কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না। শুধু যেসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সহযোগিতা চাইবে, সেসব বিষয়ে সহযোগিতা দেবে সরকার।

এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিষ্কারভাবেই বলে দিয়েছেন, তাদের সভা-সমাবেশ তথা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। তারা যেখানেই সমাবেশ করতে চাইবে, করতে পারবে। তবে রাস্তা বন্ধ করে কোনো সভা-সমাবেশ না করে পাশের কোনো মাঠে করার পরামর্শ দিয়েছেন। ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটা কর্নার করে দেওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এই মাঠ ব্যবহার করার জন্য ভাড়া দিতে হবে সবাইকে।

সংলাপে অংশ নিয়েছেন এমন একাধিক সূত্র জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা​র স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংলাপ শুরু হয়। এ সময় তিনি বলেন, তাঁর সরকার বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে এবং দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রেখেছে। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন তাঁর সরকারের মূল লক্ষ্য।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সূচনা বক্তব্য দেন ড. কামাল হোসেন। এরপর ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি তুলে ধরেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তারপর দুই পক্ষের নেতারা তাঁদের বক্তব্য, যুক্তি, পাল্টাযুক্তি তুলে ধরেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, গায়েবি ও হয়রানিমূলক হাজার হাজার মামলা দায়ের, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত প্রাণনাশ এবং বহুবিধ অবিচার ও অন্যায় ঘটে চ​লছে। এসব অ​বিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। জবাবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলার তালিকা দিলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। আর খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির বিষয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটা আদালতের বিষয়, সরকারের কিছু করার নেই। তা ছাড়া এ মামলা আওয়ামী লীগ সরকার নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অংশগ্রহণকারী বলেছেন, আলোচনার একপর্যায়ে ১৪–দলীয় জোটের শরিক দল জাসদের মইন উদ্দিন খান বাদল ২০১৪–১৫ সালে বিএনপির আন্দোলনের সময় জ্বালাও–পোড়াওয়ের প্রসঙ্গ টেনে দলটির উদ্দেশে আক্রমাণত্মক বক্তৃতা করেন। সরকারদলীয় সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিমও উত্তপ্ত বক্তব্য দেন এবং পারলে আন্দোলন করে দাবি আদায় করতে বলেন ঐক্যফ্রন্টকে।

ঐক্যফ্রন্টের একাধিক সূত্র জানায়, সব শেষে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। তাতে তিনি ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার বিষয়ে কিছু বলেননি। তবে নির্বাচনের বিষয়ে তাঁর ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান।

সংবিধানের ভেতরেই সমাধান

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ড. কামাল তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সংকট নিরসনে একাধিক বিকল্প তুলে ধরেন। তিনি নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার একটি রূপরেখা দেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিরোধী দলকে জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্রসহ একা​ধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার যে প্রস্তাব করেছিলেন, সেই বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন তাঁর লিখিত বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সংবিধানসম্মত উপায়ে সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের বিষয়কে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, কোনো বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের দরকার পড়লে তা নিয়ে আলোচনা করাও সংবিধানসম্মত। কারণ, সংবিধান সংশোধনের বিধান সংবিধানেরই অংশ।

বিরাজমান পরিস্থিতিতে সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংবিধানসম্মত একাধিক পথ খোলা আছে বলে জানান কামাল হোসেন। তিনি ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার পাশাপাশি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল–সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়ের কথাও উল্লেখ করেন। ওই রায়ের পর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে জাতীয় সংসদ।

ড. কামাল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ে পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন (দশম ও একাদশ) নির্দলীয় সরকারের অধীনে করা, নির্বাচনের ৪২ দিন আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে একটি ছোট মন্ত্রিসভা গঠনসহ বিভিন্ন নির্দেশনার কথা আছে।

সংলাপ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কামাল হোসেন তাঁর বক্তব্যে সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদের ‘খ’ উপ দফায় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা এবং সংবিধানের ৫৬(৪) অনুচ্ছেদে সংসদ ভেঙে যাওয়া এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের বিধান রয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা সংবিধানসম্মত এবং তা ‘ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের’ সংসদীয় রীতি মেনে চলা বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অনুশীলনের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ। বাংলাদেশেও ২০১৪ সালের নির্বাচন ছাড়া এর আগের নয়টি নির্বাচন সংসদ ভেঙে দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে গণপরিষদ ভেঙে দিয়েই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। তখন বঙ্গবন্ধু সংসদের সমাপনী অধিবেশনে ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিশ্বের বুকে তাঁরা একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।

বৈঠক সূত্র জানায়, ড. কামাল বলেন, সংলাপে সরকার যথাযথভাবে আশ্বস্ত করলে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ ও এর সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য সংবিধানসম্মত একাধিক নির্দিষ্ট প্রস্তাব দ্রুততম সময়ে তাঁরা দিতে পারবেন।

কামাল হোসেন তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক ইতিহাসে সংলাপ আনুষ্ঠানিকভাবে সফল না হলেও বিভিন্ন সময়ে জাতীয় স্বার্থে সমঝোতা বা একটা আপসমূলক অবস্থায় পৌঁছানোর নজির আছে। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দল গঠন, নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে অতীতের বিভিন্ন আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরেন।

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার ইতিহাস বলতে গিয়ে কামাল হোসেন বলেন, বিএনপি শুরুতে না চাইলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জনপ্রিয় আন্দোলনের মুখে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠাবিষয়ক যেসব কারণে এখানে তিনি হাজির হয়েছেন, সেসব নীতিগত কারণে সাম্প্রতিক অতীতেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সহযোদ্ধা ছিলেন বলে উল্লেখ করেন। ড. কামাল বলেন, ২০০৫ সালের ২২ নভেম্বর পল্টনে মহাসমাবেশে আওয়ামী লীগ, ১১ দল, জাসদ, ন্যাপ নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের লিখিত রূপরেখা দিয়েছিল। এর কিছু মৌলিক বিষয় আজও প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।

লিখিত বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, বিরাজমান পরিস্থিতিতে সফল সংলাপের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাপের নেতাদের মতো অমর হয়ে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ড. কামাল বলেন, ‘আপনিও জনগণের জন্য রাজনীতি করেন। আমরাও জনগণের কথা বলতে এসেছি। জনগণ ভোট দেওয়ার পরিবেশ চায়, অবাধে ভোট দিতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘আজ যুব দিবস। মোট ভোটারের অধিকাংশই যুবক। গত এক দশকেই সোয়া দুই কোটি নতুন ভোটার হয়েছে। আমরা তাদের হতাশ করতে চাই না।’

সংলাপে অংশ নিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে গণভবনে পৌঁছান। এর আগে কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় বৈঠক করে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা সংলাপে উপস্থাপনের জন্য একটা লিখিত বক্তব্য তৈরি করেন।

এই সংলাপে অংশ নিতে প্রথমে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে ড. কামালসহ ১৬ জন নেতার তালিকা দেওয়া হয়। গতকাল আরও ৫ জনের নামের তালিকা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে পাঠানো হয়। নতুন যোগ হওয়া ব্যক্তিরা হলেন বিএনপির আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, গণফোরামের মোকাব্বির খান, জগলুল হায়দার আফ্রিক, আ ও ম শফিক উল্লাহ। তবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সংলাপে যোগ দেননি।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও ১৪–দলীয় জোটের নেতারা বিকেলেই গণভবনে পৌঁছে যান। সেখানে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে এবং নিজেরা অনানুষ্ঠানিকভাবে সংবিধানের নানা ধারা-উপধারা নিয়ে আলোচনা করেন।

ঐক্যফ্রন্টের আন্দোলন চলবে

সংলাপ শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ড. কামালসহ বেশির ভাগ নেতা তাঁর বেইলি রোডের বাসায় যান। সেখানে অল্প সময় আলোচনা করে তাঁরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। কামাল হোসেন বলেন, ‘সবার আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন। উনি আমাদের প্রস্তাবের বিষয়ে আরও স্পষ্ট করতে পারতেন।’

এ সময় কামাল হোসেন তাঁর পক্ষ থেকে একটি লিখিত বক্তব্য গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরীকে পড়ে শোনাতে বলেন। সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের ওপর কোনো বাধা থাকবে না। ইতিমধ্যে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে আমরা বলেছি। তিনি গায়েবি মামলার তালিকা দিতে বলেছেন।’

এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘আমরা আমাদের সাত দফা উপস্থাপন করেছি। বাকি মানা না মানা ওনাদের বিষয়। আমাদের আন্দোলন চলবে।’ এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার, গণফোরামের মহাসচিব মোস্তফা মহসিন মন্টু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts