হাইকোর্টের রায়ে উত্তপ্ত সংসদ

parliament-of-bangladesh

বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদে ফিরিয়ে আনতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করায় সংসদ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার দশম অধিবেশনের শেষদিন সংসদ সদস্যরা এ ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা আইনমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেন।

এ পরিস্থিতিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ রায়কে সংবিধানপরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা হবে। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনার বিধান যুক্ত করে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট সেই সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন।

হাইকোর্টের রায় নিয়ে সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন জাতীয় পার্টির সিনিয়র এমপি ফখরুল ইমাম। পরে আলোচনায় অংশ নেন দলটির প্রেসিডিয়ামের সদস্য ও সিনিয়র এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ এবং জাসদের মাঈন উদ্দিন খান বাদল। তারা আদালতের রায়ের বিষয়ে আইনমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেন।

পরে আইনমন্ত্রী ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিলে এ বিষয়ে ফের পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে সুপ্রিমকোর্টের ৯ জন আইনজীবী একটি রিট আবেদন দায়ের করেন। রিট শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের তিন বিচারপতির একটি বেঞ্চ ওই সংশোধনী অবৈধ বলে রায় দেন।

সংসদে তোফায়েল আহমেদ বলেন, আদালতের রায় শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি। হাইকোর্টের বিচারপতিদের কাছে আজ আমরা জিম্মি হয়ে পড়েছি। অথচ আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বলে অনেকে বিচারপতি হয়েছেন। তিনি বলেন, এই সংসদ সার্বভৌম সংসদ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বক্তব্য রেখেছিলেন। আজকে বিচারপতিরা যে রায় দিয়েছেন তা খারাপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। আর যারা এ রায়ের সময় আইনজীবী হিসেবে ছিলেন তাদের নামের আগে অনেক বিশেষণ দেয়া হয়। সংবিধান প্রণয়নের সময় তারা ছিলেন। তারাও স্ববিরোধী কাজ করেছেন। যারা স্ববিরোধী কাজ করেন তারা সমাজে আত্মসম্মানবোধ নিয়ে বাঁচতে পারেন না।

শেখ সেলিম বলেন, সংবিধান বলে দিয়েছে জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। আমরা জনগণের প্রতিনিধি। বিচারপতিদের মনগড়া রায় দেখে অবাক হয়েছি। এ রায় সংসদকে অকার্যকর করার শামিল। ১৯৭২-এর সংবিধানের দাঁড়ি, কমা বাতিল করার অধিকার কারও নেই। বিচারপতিরা যদি ভাবেন তারা আইনের ঊর্ধ্বে তাহলে বোকার স্বর্গে বাস করবেন তারা। এই বিচারপতিদেরও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আপনারা কে কোথা থেকে এসে ওখানে বসেছেন তা জানা আছে।

পয়েন্ট অব অর্ডারে সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংসদে এ সম্পর্কে বক্তব্য দেন। এ সময় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা হৈচৈ শুরু করেন। তখন স্পিকার আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা শোনার জন্য বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অনুরোধ করলে তারা শান্ত হন।

এ সময় আইনমন্ত্রী বলেন, সংসদের সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে দেয়া এই রায় আপিল বিভাগে টিকবে না। রাষ্ট্রপক্ষ এখন আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা আইনি পথেই যাব। আমরা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র সহ্য করব না।
তিনি বলেন, আমরা সংশোধনীটি পাস করেছিলাম বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য, বিচারপতি-বিজ্ঞ বিচারকদের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য। আর্টিকেল ৯৬-এ সংশোধনীর আগে যেটা ছিল, তা হল মার্শাল ল ফরমান দ্বারা তৈরি। ১৯৭৮-এর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। আমরা সেটা পরিবর্তন করতে গিয়েছিলাম। উনারা (হাইকোর্ট) সেটা আজকের রায়ে বলে দিলেন, এটা ‘ইলিগ্যাল’। এখনও আমি বলি এটা মোটেও ইলিগ্যাল নয়। উনারা যেটা বলছেন সেটা নট মেইনটেনেবল।

আনিসুল হক বলেন, আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। এখনও বিশ্বাস করি বিচার বিভাগ স্বাধীন। আপিল করলে এই রায় গ্রহণযোগ্য হবে না। সেজন্য আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আগামী রবি-সোমবারের মধ্যে আপিল করব। এরপর দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী বিচারকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করতে গেলে সংসদ সদস্যদের বিরোধিতার মুখে পড়েন আইনমন্ত্রী। তখন তিনি সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, হাইকোর্টের এই রায় সংবিধান পরিপন্থী। আপিল করলে এই রায় গ্রহণযোগ্য হবে না।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts