তনুর খোলা চিঠি!

sohagi jahan tonu

শামীমুল হক,

আট দিন ধরে সব দেখছি আমি। কে কী করছে। কে কী বলছে। সবই আমি শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু ওরা যে আমার মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছে। আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করে ওরা উল্লাস করেছে। আমার বুক চুরমার হয়ে যাচ্ছে কিছু বলতে।

মনের ব্যথা আর ধরে রাখতে পারছি না। কীভাবে পারব বল? যখন দেখি আমার জন্য সারা দেশ আজ এক কাতারে। আমার সঙ্গে যা হয়েছে এর বিচারের দাবিতে রাজপথ উত্তাল। সবার চোখে জল। মুখে প্রতিবাদের ভাষা।

এ অবস্থায় কি করে বসে থাকি? সত্যিই আমি আজ সার্থক। আমার মতো এমন মৃত্যু হয়তো আর কারও হবে না। সত্তর দশকে প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন লিখেছিলেন, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। কই স্বাভাবিক মৃত্যুর ইচ্ছা থাকলেও তা তো আমার ভাগ্যে জুটেনি।

বড় কষ্ট নিয়ে আজ লিখতে বসেছি। সকালে একটি পত্রিকায় দেখলাম, আমার পরিবারকে প্রশাসন থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চলছে। বলা হচ্ছে ভিক্টোরিয়া কলেজের কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। জানি একদিন মরতে হবে।

তবে এমন মৃত্যু! কখনো ভাবিনি। স্বাধীন দেশে জন্ম নিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছিলাম। ভেবেছিলাম স্বাধীনতা আমায় বাঁচতে শেখাবে। স্বাধীনতা আমায় পূর্ণ অধিকার দেবে। স্বাধীনতা আমার স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হবে। আর তাই তো গ্রামের মাটিতে খালি পায়ে দৌড়েছি। নির্জলা বাতাস নিয়েছি। ছোট হাতে বই নিয়ে স্কুলে গিয়েছি। যখন বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

পিতার চাকরির সুবাধে নিয়মানুবর্তিতাই ছিল আমার জীবনের প্রথম শিক্ষা। সেখানেই নাচ-গান করেছি। নাটক করেছি। কোনোদিন কেউ বলতে পারেনি তনু খারাপ। আজ আমার অবর্তমানে আমাকে নিয়ে নানা কথা বলছে। আমাকে কলঙ্কিত করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে আমাকে কেন বিয়ে দেয়া হয়নি। আরে আমি তো ছাত্রী। ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ছিলাম। আমার তো স্বপ্ন ছিল। সে স্বপ্ন নিয়ে এগুচ্ছিলাম। আর বিয়ে না দেয়াও কী তাহলে অপরাধ।

আচ্ছা বলুন তো প্রেম করলেই কী তাকে এমন নৃশংসভাবে জীবন দিতে হবে। প্রশাসনের ভাবখানা এমন যেন প্রেম করলে এমনভাবে মরতেই পারে। বিয়ে না দিলে এমন হতেই পারে। কাজেই প্রশাসনের কোনো দোষ নেই। যারা আমার সঙ্গে এমন করেছে তারা নির্দোষ। তাহলে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, দেশে যত মেয়ে আছে, যারা প্রেম করছে তাদের ধরে এনে এভাবে মেরে ফেলুন। দেখুন কার কার ঘরে বিয়েযোগ্য কন্যা রয়েছে তাদেরও ধরে এভাবে শাস্তি দিন।

কারণ আপনাদের দৃষ্টিতে প্রেম ও বিয়ে না দেয়া অপরাধ। প্রশাসন যখন আমার মা আনোয়ারা বেগমকে এসব প্রশ্ন করছিল তখন তিনি চিৎকার করে কাঁদছিলেন। আমার মাও প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এইগুলো কী জিজ্ঞেস করে? ক্যান করে? তনুর খুনের সঙ্গে এগুলোর কী সম্পর্ক? আমিও আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখলাম, আমার খুনের সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক আছে কী? আমাকে খারাপ প্রমাণ করতে পারলে খুন কী বৈধ হয়ে যাবে?

আমার হত্যার বিচার দাবিতে গোটা দেশ আজ উত্তাল। কুমিল্লায় প্রতিদিন হচ্ছে আন্দোলন। দোষীদের চিহ্নিত, গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে রাজপথে আগুন জ্বলছে। দেশের ৬৪ জেলা জেগে উঠেছে। সকল স্কুল-কলেজ আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্তব্ধ হয়ে গেছে। গণজাগরণ মঞ্চ মাঠে নেমেছে।

পত্র-পত্রিকাগুলো সরব। সবারই এক দাবি। তনু হত্যার বিচার। আচ্ছা বলুন তো যেখানে আমাকে হত্যা করা হয়েছে। আমার সঙ্গে আরও অনেক কিছু করা হয়েছে সেখানে এমন কাজ করে কেউ কী পার পেতে পারে। আমি তো সেই মাটিতেই বড় হয়েছি। সেখানকার ঘাস, ফুল আমাকে চিনে। তারা আমার আপনজন। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমার পদচিহ্ন পড়েনি।

সেই চেনা পথে আমার মৃত্যুদূত দাঁড়িয়ে থাকবে আমি নিজেও তো কোনোদিন ভাবিনি। যারা আমার সঙ্গে এমন করেছে তাদের কী মা-বোন নেই। তারা কী বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন- তাদের কন্যার বেলায়ও একদিন এমন হবে না। নাহ! আমি কখনো এমনটা হউক চাই না। আমি চাই না আর কোনো বোন আমার মতো ভাগ্যবরণ করুক। আমি চাই চিরদিনের মতো এমন ঘটনার বিলুপ্তি ঘটুক।

(মতামত বিভাগের লেখা একান্তই লেখকের নিজের মতামত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নয়)

 

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts

Leave a Comment