ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে বিএনপির ভিশন-২০৩০

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক বৃহস্পতিবার

দেশে দুর্নীতি-দুঃশাসন চরম আকার ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এ অবস্থান থেকে বেরিয়ে অংশীদারিত্বমূলক সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে ‘রূপরেখা-২০৩০’ ঘোষণা করেছেন তিনি।

শনিবার দুপুরে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে বিএনপির ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘অংশীদারিত্বমূলক সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নগড়ে তোলা বিএনপির লক্ষ্য। বিএনপি বিশ্বাস করে জনগণই সকল উন্নয়নের চাবিকাঠি।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘দেশে গণতন্ত্র নেই, বৈধ সরকার নেই, সুশাসন নেই, ন্যায় বিচার নেই, নারীর সম্মান ও মানবাধিকার বিপন্ন, নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নেই। জাতিকে উশৃঙ্খল, দিশেহারা করা হয়েছে। জাতিকে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সকল স্তরে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। বিএনপির পরম গৌরবের বিষয় হচ্ছে শহীদ জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র এনেছেন।’

খালেদা জিয়া বলেন, ‘শুধু বিএনপিই পারে ইতিবাচক এবং ভবিষ্যত রাজনীতি করতে। এটা শুধু কথার কথা না। আমরা যা করি তা বাস্তবায়ন করি। আমরা বিনামূল্যে ঘরে ঘরে চাকরির কথা বলে মিথ্যা আশ্বাস দেই না।’

বিএনপি বিরোধী দলে থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে উল্লেখ করে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘জাতিকে পেছনে ঠেলে দেয়া নষ্ট রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ভবিষ্যত অন্ধকার।’

‘ভিশন-২০৩০’ রূপরেখায় মানবাধিকার, সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দূর করার অঙ্গিকার করেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা ভারসাম্য করতে সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা বলেন তিনি। জাতীয় সংসদ দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেন তিনি। সকল স্তরে ব্যাপক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকারকে সুশাসনের সহায়ক পরিবেশ করে কাঙ্খিত উন্নয়ন করার প্রতিশ্রুতি দেন খালেদা জিয়া।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি দুর্নীতির সাথে আপোষ করবে না।’ দুর্নীতি বন্ধ করতে ন্যায়পাল পদ কার্যকরী করার কথাও বলেন খালেদা।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বিএনপি সবসময় তৎপর। সন্ত্রাস দমনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমরা একযোগে কাজ করে যাবো। দেশের ভূখন্ডে কোনো সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী ততপরাতা মেনে নিবে না। এর বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে কার্যকর ব্যবস্থা নিবে।’

তিনি বলেন, শুধু ধনীদের নয়, দরিদ্রদের মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এক দশকের মধ্যেই দেশ থেকে নিরক্ষতা দূর করা হবে। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা কেও আধুনিকায়ন করা হবে। শিক্ষা বিস্তারের জন্য আলাদা টিভি চ্যানেল খোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলে খালেদা। বলেন, মেয়েদের স্নাতক এবং ছেলেদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবনৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলেন তিনি।

শস্যবিমার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কৃষি আধুনিকায়কন, স্বাস্থ সেবার বিএনপি অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনা একই ভাবে বিএনপি আশা করে অন্য কোনো দেশ বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। প্রতিবেশিদের সঙ্গে সততার মাধ্যমে সম্পর্ক রাখার কথা বলেন। নারী শিশু, পরিবেশ প্রভৃতি ইস্যুতে কথা বলেন খালেদা জিয়া।

তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনসহ জাতীয় ঐতিহ্যসমূহ রক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হবে। সড়ক রেল ও নৌপথের সংস্কারের কথা বলেন খালেদা জিয়া। দরিদ্র, বস্তিবাসী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠির আবাসন নিয়ে ব্যাপক চিন্তা রয়েছে খালেদা জিয়ার নতুন ভিশন ২০৩০।’

এর আগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে কাউন্সিল উদ্বোধন করেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার নেতা-কর্মীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। সম্মেলনে উপস্থিত সবাই জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মেলান।

জাতীয় সঙ্গীতের পর পরিবেশন করা হয় বিএনপির দলীয় সঙ্গীত। এরপর ষষ্ঠ কাউন্সিলের থিমসং পরিবেশিত হয়। সকাল ১০টা ২৮ মিনিটের দিকে তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এসে পৌঁছান বেগম জিয়া। গেটে তাকে স্বাগত জানান দলীয় নেতাকর্মীরা। এসময় স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো কাউন্সিলস্থল।

এর আগে ৯টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরে তার বাসভবন ফিরোজা থেকে নিজস্ব নিরাপত্তা (সিএসএফ) বলয়ে রওনা দেন তিনি। অবশ্য সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কাউন্সিলের কার্যক্রম শুরু করার কথা ছিল বিএনপি চেয়ারপারসনের।

এদিকে কাউন্সিলস্থলে জড়ো হয়েছেন সারা দেশ থেকে আসা দলের নেতাকর্মীরা। ভোর থেকেই আসতে শুরু করেন তারা। আমন্ত্রিতরা মঞ্চের সামনে নিজ নিজ সংরক্ষিত আসনে বসছেন।

বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দলের চেয়ারপারসন পদে বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে তারেক রহমান আগামী তিন বছরের জন্য বিনা প্রতিন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মূল ফটকের সামনে দীর্ঘ লাইনে আমন্ত্রিতদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। নির্দিষ্ট কার্ড থাকা সত্ত্বেও ভেতরে প্রবেশে তাদের দারুণ বেগ পেতে হয়েছে। ধাক্কাধাক্কি করে তাদের প্রবেশ করতে হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীদের তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা যায়।

কাউন্সিলে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাংবাদিক শফিক রেহমান, মাহফুজউল্লাহ, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, ইসমাইল জবিউল্লাহ, কবি আল মুজাহিদী, সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতা রুহুল আমিন গাজী, এম এ আজিজ, এম আবদুল্লাহ, সৈয়দ আবদাল আহমেদ ছিলেন।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, ভারত, রাশিয়া, কুয়েতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে যোগ দেন। তাদের কয়েকজন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের নেতাদের মধ্যে রয়েছেন অলি আহমদ, সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিম, আন্দালিব রহমান পার্থ, শফিউল আলম প্রধান, মোস্তফা জামাল হায়দার, খন্দকার গোলাম মূর্তজা, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জেবেল রহমান গানি, মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, রেদোয়ান আহমেদ, মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস, মাওলানা মহিউদ্দিন ইকরাম, আহমেদ আবদুল কাদের, সাহাদাত হোসেন সেলিম, খন্দকার লুৎফর রহমান, গোলাম মোস্তফা ভুইয়া, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা প্রমুখ।

বিএনপি নেতাদের মধ্যে রয়েছেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, এম মোরশেদ খান, রাবেয়া চৌধুরী, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, হারুন আল রশীদ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, খন্দকার মাহবুব হোসেন, আবদুল আউয়াল মিন্টু, মাহমুদুল হাসান, ওসমান ফারুক, আবদুল মান্নান, মীর নাসিরউদ্দিন, এ জে মোহাম্মদ আলী, মুশফিকুর রহমান, আবদুল হালিম, রুহুল আলম চৌধুরী, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, আমীনুল হক, আবদুল কাইয়ুম, জয়নাল আবেদীন, এজেডএম জাহিদ হোসেন, জহুরুল ইসলাম, আহমেদ আজম খান, মিজানুর রহমান মিনু, মাহবুব উদ্দিন খোকন, রুহুল কবির রিজভী, আসাদুল হাবিব দুলু, ফজলুল হক মিলন, মশিউর রহমান, মজিবুর রহমান সারোয়ার, গোলাম আকবর খন্দকার, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, আসাদুজ্জামান রিপন, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবদুস সালাম, জিএম ফজলুল হক, কাজী আসাদুজ্জামান, সৈয়দ মোয়জ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবীর খোকন, নাজিমউদ্দিন আলম, সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, নজরুল ইসলাম মঞ্জু, নিতাই রায় চৌধুরী, কারাবন্দি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, শামা ওবায়েদ প্রমুখ।

ছাত্রনেতাদের মধ্যে উপস্থিত আছেন-সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, আবদুল কাদের ভুইয়া জুয়েল, হাবিবুর রশিদ হাবিব, বিএম নাজিম মাহমুদ, রাজিব আহসান, আলমগীর হাসান সোহান, সাদিউল কবির নীরব, বায়েজিদ আরেফিন প্রমুখ।

এবারের কাউন্সিলের স্লোগান হচ্ছে- ‘দুর্নীতি দুঃশাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ।’ তবে বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোও (জাতীয়তাবাদী যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, শ্রমিক দল, ওলামা দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাস) আলাদা আলাদা স্লোগান ঠিক করেছে। নিজ নিজ সংগঠনের পক্ষে পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন তৈরি করেছে তারা। কাউন্সিলের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘মুক্ত করবই গণতন্ত্র’।

২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপির সর্বশেষ পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরের বছর জানুয়ারিতে গঠন করা হয় ৩৮৬ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কাউন্সিল হয়। দ্বিতীয় কাউন্সিল হয় ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আর এর আট বছর পর ১৯৮৯ সালের ৮ ও ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় দলটির তৃতীয় কাউন্সিল। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের ১, ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর চতুর্থ কাউন্সিল করে বিএনপি।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts

Leave a Comment