ঋণের নামে ব্যাংকে চলছে লুটপাট

Bangladesh Bank logo

ঋণের নামে ব্যাংকিং খাতে লুটপাট চলছে। একটি চক্র ঋণ নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছে না। এ কারণে খেলাপি ঋণ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। আর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় একদিকে ভালো উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না, অপরদিকে বিনিয়োগের অন্যতম শর্ত সুদের হারও কমানো যাচ্ছে না।

ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের সার্বিক অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, সাবেক ব্যাংকার এবং দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার কর্মকর্তারা এসব কথা বলেছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, এভাবে চলতে থাকলে একসময় ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে। তাদের মতে, ব্যাংকে পরিচালকদের নিজস্ব কোনো তহবিল নেই। যে টাকা লুটপাট হচ্ছে তা গ্রাহকের আমানতের। ফলে লুটপাটের সঙ্গে জড়িতরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে গ্রাহকরা নিঃস্ব হয়ে যাবেন। এতে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৯৮ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। তবে অবলোপন করা ঋণ মিলিয়ে তা ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত তিন মাসে বেড়েছে আট হাজার ৪০ কোটি টাকা।

এভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করলে কিছু হয় না। এ কারণে প্রতিনিয়ত খেলাপি ঋণ বাড়ছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার কারণে দেশে তেমন বিনিয়োগ নেই। সে কারণে বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করা হচ্ছে। এতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, খেলাপি ঋণের জন্য শৃংখলা ও সুশাসনের ঘাটতিই দায়ী।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যাংকিং খাতে অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। অনিয়মকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে করে ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট বাড়ছে। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের প্রতি মানুষের কোনো আস্থা নেই।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এত বেশি খেলাপি ঋণ থাকলে সুদের হার কমার সুযোগ থাকে না। যা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। তার মতে, খেলাপি ঋণ রোধে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের মতে, দুর্নীতি ও আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ ঋণ আরও বাড়বে। কারণ বর্তমানে খেলাপির যে চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে, তা অন্তত এক বছর আগের। এরপর নতুন তথ্য এলে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, গত তিন মাসেই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে আট হাজার ৪০ কোটি টাকা। গত মার্চ শেষে এর পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। ৩ মাসের ব্যবধানে এত পরিমাণে বৃদ্ধি এর আগে দেখা যায়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর। তিন মাসে এ খাতের খেলাপি ঋণ চার হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেড়ে ২৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে মোট ঋণের ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ খেলাপি ছিল, এখন তা বেড়ে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঋণের ৭৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এখন খেলাপি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩২ দশমিক ২১ শতাংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

তিন মাসে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ তিন হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ২৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। আগের প্রান্তিক শেষে ২৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা বা ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ ছিল খেলাপি। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতার খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

আগের প্রান্তিকে যেখানে ব্যাংকটির দুই হাজার ৮৩০ কোটি টাকা ছিল খেলাপি, এখন তা পাঁচ হাজার ৪১ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। আর নানা অনিয়মের কারণে আলোচনায় থাকা বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছয় হাজার ৩৯২ কোটি টাকা থেকে সামান্য বেড়ে ছয় হাজার ৮২৫ কোটি টাকা হয়েছে; যা মোট ঋণের ৫৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts