এক নারীর গর্ভের সন্তান খুনের আসামি হওয়ার কাহিনী

Share Button

তাঁর গর্ভে আসে প্রেমিকের সন্তান। কিন্তু প্রেমিক তাঁকে বিয়ে করেননি। সন্তানের পিতৃত্বও অস্বীকার করেন। নির্দেশ দেন গর্ভের সন্তান নষ্ট করার। কিন্তু গর্ভের সন্তান নষ্ট না করে পিতৃত্ব আদায়ের সব রকমের চেষ্টা চালান। কিন্তু ব্যর্থ হন। এরপর গর্ভের সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর খুন করে লাশ গোপন করেন। সম্প্রতি রাজধানীতে এক নারীর বিরুদ্ধে এমনই এক শিশু খুনের অভিযোগে এনে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ রোববার ঢাকার একটি আদালত ওই নারীকে দুই দিন রিমান্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার এজাহারের তথ্যমতে, ৫ মার্চ রাজধানীর রমনার ১ নম্বর বেইলি রোডের একটি ভবনের ১৫তলা ছাদের লোহার সিঁড়ির পাশ থেকে অজ্ঞাত এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু লাশের পরিচয় না পেয়ে পুলিশ বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই নবজাতকের মা ওই অ্যাপার্টমেন্টের একজন গৃহকর্মী। পরে রমনা থানার এসআই শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে ওই নারী ও তাঁর প্রেমিকের বিরুদ্ধে খুনের মামলা করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম খায়রুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, নবজাতকের লাশ পেলেও তাঁর পরিচয় উদ্ধারে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে একটি টেক্সটাইল কোম্পানির শপিং ব্যাগ, দুটি জাতীয় দৈনিক। কারণ, ওই নবজাতককে ওই দুটি পত্রিকায় মুড়িয়ে রাখা হয়েছিল। ফ্ল্যাটের পত্রিকা দেওয়া এক হকারের দেওয়া তথ্যে বেরিয়ে আসে ওই নবজাতকের মায়ের পরিচয়। তিনি এখন তাঁদের হেফাজতে রয়েছেন। নবজাতককে হত্যার নির্দেশদাতা ওই নারীর প্রেমিক যুবককে শিগগিরই গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

এজাহারের বক্তব্য অনুযায়ী, ৫ মার্চ রমনার বেইলি রোডের একটি ভবনের ১৫ তলার ছাদ থেকে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় মোড়া নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ফ্ল্যাটের আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করেও নবজাতকের লাশের পরিচয় সেদিন বের করতে পারেনি পুলিশ। তবে ওই শিশুর ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ করে রাখে। এরপর নবজাতকের পরিচয় খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। প্রথমে ওই ভবনে পত্রিকার হকারকে জিজ্ঞাসা করা হয়। তিনি পুলিশকে বলে দেন, ওই দুটি জাতীয় দৈনিক রাখেন সেখানকার এক ব্যক্তি। পরে তাঁদের পরিবারের তিন সদস্যকে জিজ্ঞাসা করা হয়। তাঁরা তখন পুলিশকে বলেন, তাঁরা ওই পত্রিকা বাসায় রাখেন এবং ওই গৃহকর্মীও তাঁদের বাসায় কাজ করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা বাশার বলেন, ওই নারীকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি এসব বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। তবে তিনি অসুস্থ, এটা তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা বলে দেন, তিনি প্রসবজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন। এরপরই নিশ্চিত হন, নবজাতকের মা ওই নারীই। পরে জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারীও তা স্বীকার করেন।

পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ময়মনসিংহের ওই নারী রমনার বেইলি রোডের বাসায় চার বছর ধরে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাঁরই এলাকার এক যুবকের সঙ্গে মোবাইলের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয়। দুই বছর আগে এই দুজনের প্রেমের সম্পর্ক। ওই নারী গত ঈদুল ফিতরের সময় গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যান। তখন ওই যুবক বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। এরপর ঢাকায় ফিরে আসেন এই নারী। পাঁচ-ছয় মাস পর টের পান তিনি অন্তঃসত্ত্বা।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি তাঁর প্রেমিককে মোবাইল ফোনে জানান। জবাবে ওই প্রেমিক বলে দেন, ওই সন্তান তাঁর নয়। সন্তানের স্বীকৃতি দেবেন না। বিয়েও করবেন না। পেটের সন্তানকে নষ্ট করার নির্দেশ দেন। সন্তান নষ্ট করলে নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা মাথায় নিয়ে ওই নারী পেটের সন্তান নষ্ট করেননি। তবে ২ মার্চ বেইলি রোডের ১৫তলার ওই বাসার বাথরুমে রাত নয়টার দিকে একটি জীবিত ছেলেসন্তান প্রসব করেন। পরে বাথরুমের ভেতরেই সন্তানকে গলা টিপে হত্যা করেন এই নারী।

ওই নারীকে আজ রোববার ১০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হলে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালত চত্বরে ওই নারী বলেন, তিনি তাঁর প্রেমিকের হাত-পায়ে ধরে বলেছিলেন, তাঁকে যেন বিয়ে করেন। সন্তানের পরিচয় দেন। কিন্তু তিনি দেননি। নিজের হাতে নিজের সন্তানকে খুন করেছি। আর কোনো নারীর জীবন যেন তাঁর মতো না হয়। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, কোনো নারী কি নিজের সন্তানকে হত্যা করতে চান? ওই যুবকের এমন নিষ্ঠুর আচরণের জন্য তিনি আজ খুনের মামলার আসামি।

আদালতে এই নারীর পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts