বনানীতে দুই তরুনী ধর্ষিত : ধর্ষকরা কে কোথায়?

বনানীতে ধর্ষিত দুই তরুণীকে
Share Button

বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে ধর্ষিত দুই তরুণী কার্যত বন্দি হয়ে পড়েছেন। মামলা করার পর থেকে তারা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। ধর্ষিতরা বন্দি হলেও উন্মুক্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে অভিযুক্তরা। তাদের কেউ কেউ আবার নিজের বাসায়ও অবস্থান করছে। তারা ভাইবার-হোয়াটসঅ্যাপে সক্রিয় আছে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছে। অথচ পুলিশ তাদের খুঁজে পাচ্ছে না। এমনকি এ মামলার আসামিরা যেন বিদেশে পালাতে না পারে সেজন্য সব বিমানবন্দরে সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ।

মামলার প্রধান আসামি সাফাত আহমেদ বাসায় আছে এমন তথ্য দিয়েছেন তার বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিম। আসামি ধরতে পুলিশের আগ্রহ আছে কিনা এ নিয়ে এখন যথেষ্ট সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এর আগে বনানী থানার পরিদর্শক আবদুল মতিন বলেছিলেন, সাফাতের বাসায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত বনানী থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাফাতের বাবা দিলদার আহমেদ সেলিম যুগান্তরকে বলেন, সাফাত বাসায়-আসা যাওয়া করছে। তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। তবে সকালের পর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি।

এদিকে ধর্ষিত দুই তরুণীর করা মামলার প্রতিবেদন দাখিলে ২১ দিন সময় পেয়েছে পুলিশ। ২৯ মে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রোববার ঢাকা মহানগর হাকিম দেলোয়ার হোসেন প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেন। আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এদিকে ঘটনার সময় উপস্থিত এমন আরও দুই তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ।

এ ঘটনার তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য মো. নজরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর সদস্য হচ্ছেন- কমিশনের অবৈতনিক সদস্য নুরুন নাহার ওসমানী, এনামুল হক চৌধুরী, কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) মো. শরীফ উদ্দীন ও কমিশনের সহকারী পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) এম রবিউল ইসলাম। সদস্যরা  ভুক্তভোগী দুই তরুণীর সঙ্গে কথা বলেছেন। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ ঘটনাকে কমিশন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
মামলা করার দু’দিন পরও কোনো আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় আতঙ্কে আছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের আশঙ্কা অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম বলেন, আসামিরা যতই প্রভাবশালী হোক তাদের গ্রেফতার করা হবে। আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। এটি একটি চাঞ্চল্যকর মামলা হওয়ায় বনানী থানার পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ছায়া তদন্ত করছে।
আসামিরা কেউ পালিয়ে গেছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে নাজমুল আলম বলেন, আসামিদের কেউ পালিয়ে গেছে এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তারা পালাতে পারবে না। তারা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে এ বিষয়েও সতর্ক রয়েছি আমরা। ইতিমধ্যেই দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতার করা হবে।

ভুক্তভোগী দুই তরুণীর অভিযোগ, ২৮ মার্চ বন্ধু সাদনান সাকিফের প্ররোচনায় জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে ধর্ষিত হন। ওই রাতে বনানীর দি রেইনট্রি হোটেলে তারা ধর্ষণের শিকার হন। আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ নামে দু’জন তাদের সারা রাত হোটেলের দুটি কক্ষে অস্ত্রের মুখে আটকে রেখে ধর্ষণ করে। সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেছে ধর্ষকরা। এখন ওই ভিডিও প্রকাশসহ তাদের খুন-গুম করার হুমকি দিচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে ধর্ষকরা।

ভুক্তভোগী দুই তরুণীর অভিযোগ, বিখ্যাত একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয়ার নাম করে তাদের ওই হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার সময় ধর্ষকরা প্রথমে তাদের ঘড়ি কেড়ে নেয়। পরে মোবাইল ফোনও কেড়ে নেয়। সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ধর্ষণের ঘটনার ভিডিও করে। সাফাতের গাড়িচালক আমাদের ফোন দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে। সে সাফাত ও নাঈমের ছবি ঝাপসা করে ধর্ষণের ভিডিও প্রকাশ করে দেয়ারও হুমকি দেয়। পরে বাধ্য হয়ে আমরা থানায় অভিযোগ দেই।

তারা আরও বলেন, পত্রিকায় আমাদের নাম প্রকাশ না হলেও আমরা বাইরে বের হতে পারছি না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছি না। পুলিশ সার্বক্ষণিক আমাদের সঙ্গে থাকছে। আমাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। আমরা কার্যত বন্দি হয়ে গেছি।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মামলার আসামিদের দুই বান্ধবী নাজিয়া ও তানজি আলিশাকে খোঁজা হচ্ছে। ঘটনার দিন রাতে হোটেলে তারা উপস্থিত ছিলেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন। এমনকি সাক্ষী হিসেবে তাদের জবানবন্দিও এ মামলা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে সোমবার মামলার বাদী তরুণীকে নিয়ে দি রেইনট্রি হোটেল পরিদর্শন করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মতিন। বেলা পৌনে ৩টায় তিনি বাদীকে নিয়ে রেইনট্রিতে যান। পায় ৪০ মিনিট তারা হোটেলে অবস্থান করেন। এ সময় হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে মানবাধিকার কমিশন বলেছে, বনানীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ধর্ষক প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ মামলা নিতে দেরি করেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক ঘটনাটিকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কমিশন অভিযোগ আমলে নিয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফাহানা সাঈদ যুগান্তরকে বলেন, কমিটির সদস্যরা প্রয়োজনীয় স্থানগুলো পরিদর্শন, সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
আসামিরা হোয়াটসঅ্যাপ-ভাইবারে সক্রিয় :

ধর্ষণ মামলার দুই আসামি নাঈম আশরাফ ও সাফাত আহমেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকলেও তারা ভাইবার-হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। সাদনান সাকিফের ফেসবুক আইডি সম্পর্কে জানা যায়নি। তবে সেও হোয়াটসঅ্যাপে সচল রয়েছে। সোমবার তাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে নাঈম আশরাফের প্রতিষ্ঠান ই-মেকার্স বাংলাদেশের ফেসবুক পেজটি এখনও খোলা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, গ্রেফতার এড়াতে তারা মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ রেখেছে। ওয়াইফাই দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ করছে

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts