রাজধানীজুড়ে পানি সংকট

রাজধানীজুড়ে পানি সংকট

‘দেড় মাস ধরে ওয়াসার পানি পাচ্ছি না। রান্না-গোসল-কাপড় পরিষ্কারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কাজের জন্য পানি কিনতে হচ্ছে। কেনা পানি দিয়ে প্রতিদিন গোসল করা সম্ভব হয় না। এজন্য কয়েকদিন পরপর গোসল করি।

এভাবে কতদিন চলা যায়। ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালেও তারা নির্বিকার।’ এভাবে পানির কষ্টের বর্ণনা দিচ্ছিলেন রাজধানীর ৬৫/২ বোরহানপুর-হাজারীবাগের বাসিন্দা হুমায়ুন আহমেদ।

শুধু বোরহানপুরের হুমায়ুন আহমেদ নন, পানির কষ্টে ভুগছেন রাজধানীর লাখ লাখ মানুষ। ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এলাকাবাসী পানি সংকটের কথা জানালেও কোনো প্রতিকার মিলছে না। এদিকে গরম শুরুর আগেই পানির এই সংকট সামনের তাপদাহের সময় আরও বড় ধরনের সংকটের বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন নগরবাসী।

সরেজমিনে ঘুরে এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরনো ঢাকার হাজারীবাগের এনায়েতগঞ্জ, নীলাম্বর সাহা রোড, ভাগলপুর লেন, বাড্ডানগর লেন, কুল্লাল মহলসহ বেশ কয়েকটি মহল্লায় প্রায় দেড় মাস ধরে তীব্র পানি সংকট চলছে। বিশেষ করে এনায়েতগঞ্জ ও নীলাম্বর সাহা রোড এলাকার বাসিন্দাদের এক কলস পানির জন্য রাত জেগে থাকতে হচ্ছে। এছাড়া ভাগলপুর জেলেপাড়া, হাজীপুর ও মধ্য জেলেপাড়ায় রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি এলেও তা দুর্গন্ধযুক্ত। পানের উপযোগী নয়। নিকটবর্তী ওয়াসার পাম্প বা পরিচিতজনদের বাসা-বাড়ি থেকে ড্রাম-কলস-বালতি ভরে পানি সংগ্রহ করে প্রয়োজন মেটাচ্ছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। জানা যায়, হাজারীবাগ পার্ক পানির পাম্পের উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। প্রতি মিনিটে যেখানে ৪ হাজার ২শ’ লিটার পানি উত্তোলন হওয়ার কথা। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ৬শ’ থেকে ১ হাজার ৮শ’ লিটার। যার ফলে ওই এলাকায় তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে।

৫৮/১ ভাগলপুর লেনের বাসিন্দা আবদুল হক জানান, ‘এ এলাকায় সরবরাহ করা পানি খুবই দুর্গন্ধযুক্ত। ওই পানি পান করে পেটের পীড়া-দাঁত লাল হয়ে যাওয়া, চুলপড়া এবং চর্মজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।’

২৪ নম্বর ভাগলপুর লেনের বাসিন্দা ইকবাল কবির জানান, ‘ভাগলপুর লেনসহ আশপাশের এলাকায় পানি সরবরাহ করা হয় হাজারীবাগ পার্কসংলগ্ন পাম্প থেকে। ওই পাম্পটির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় মূলত পানি সংকট হচ্ছে বলে আমরা জেনেছি।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বেশ আগে জানলেও পাম্প সংস্কার বা নতুন পাম্প স্থাপনের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।’

একই অবস্থা পুরান ঢাকার ইসলামবাগ, কামালবাগ, চাঁদনীঘাট এলাকায়। ওই এলাকাগুলোতেও এক মাসের বেশি সময় ধরে পানি সংকট চলছে। রান্না-খাওয়া-গোসলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের পানির চাহিদা পূরণ করতে বাইরে থেকে পানি কিনতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। ঢাকা ওয়াসার মড্স জোন-২-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এলাকাবাসী সমস্যার কথা জানালেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

হাজারীবাগ ও ইসলামবাগ এলাকার পানি সংকটের ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার মড্স জোন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সুজাবত আলী তালুকদার জানান, ‘ওই এলাকার দুটি পাম্পের উৎপাদন ক্ষমতা কমে গেছে। এ কারণে দুটি নতুন পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। আশাকরি চলতি মাসের মধ্যে ওই এলাকার পানি সংকট নিরসন করা সম্ভব হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা ওয়াসার মড্স জোন-৮-এর খিলবাড়িটেক ও ৩০ একর এলাকায় পানি নিয়ে লুকোচুরি চলছে। এই পানি আছে তো, এই নেই। পানি বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলীরা মুখ দেখে পানি বিতরণ করছেন বলেও এলাকাবাসীরা জানান। ঢাকা ওয়াসার মড্স জোন-৮-এর খিলবাড়িটেক, ৩০ একর এলাকায় প্রভাবশালী লোকের বসবাস না হওয়ায় প্রকৌশলীরা তাদের নিয়মিত পানি দিচ্ছেন না।

খিলবাড়িটেকের গৃহবধূ রাবেয়া বেগম জানান, ‘ওয়াসা আমাদের এলাকায় পানি নিয়ে টালবাহানা শুরু করেছে। পাম্পের কাছাকাছি থেকেও পানি পাচ্ছি না। অথচ অনেক দূরের লোক পানি পাচ্ছে।’

জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার মড্স জোন-৮-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সরকার ক্ষীতিস বাবু বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে পানির চাহিদা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে পকেট (ছোটখাটো) সংকট দেখা দিয়েছে। এ এলাকায় একটি পাম্প বসানো ছাড়া এ সংকট নিরসন করা যাবে না। কিন্তু পাম্প বসানোর মতো জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, উঁচু-নিচু জায়গার কারণেও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমস্যার কারণেও পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। তবে কোনো সংকটই স্থায়ী নয়; পাইপের মাধ্যমে না হলেও গাড়িতে করে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

পরীবাগের বাসিন্দারা জানান, ‘ওই এলাকায় ১৫-২০টি ভবনে ১২ ঘণ্টা পানি থাকে না। ঢাকা ওয়াসা থেকে পানি কিনে প্রয়োজন মেটাচ্ছেন তারা। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে এই এলাকায় পানির সংকট চলছে।’

এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার মড্স জোন-৬-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘পরীবাগ এলাকার পানির সংকট প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আমরা সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরীবাগ এলাকায় আমরা একটি পাম্প বসাতে চাই। কিন্তু জায়গা সংকটে বসাতে পারছি না।’

প্রায় এক মাস ধরে পানি সংকটে ভুগছেন পল্লবীর সবুজ বাংলা আবাসিক এলাকার অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ। পানি সংকটের কারণে ওই এলাকার মানুষ রান্না-গোসল-খাবার পানি জোগাড় করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। ৯ মার্চ জনস্বার্থ রক্ষা জাতীয় কমিটি পানির দাবিতে ওই এলাকায় মানববন্ধন ও সমাবেশ করে। ওই কর্মসূচিতে পল্লবী থানা মুজিব সেনা ঐক্য লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. লিটন, পল্লবী মঙ্গল বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম ঢাকা ওয়াসার উদ্দেশে বলেন, ‘দ্রুত পানির সংকট নিরসন করুন, নইলে আন্দোলনে নামব আমরা।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনস্বার্থ রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক মো. আমিনুল ইসলাম বুলু বলেন, ‘পল্লবী এলাকায় পানির অভাবে মানুষ অত্যন্ত কষ্টে রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার কাছে অভিযোগ জানালেও কোনো প্রতিকার মিলছে না।’

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, মহানগরীর মুগদা, মাণ্ডা, খিলগাঁও, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ইসলামবাগ এবং দক্ষিণ খানের বিভিন্ন এলাকায়ও পানির তীব্র সংকট চলছে। অনেক এলাকায় নোংরা পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পানি দিয়ে কোনো রকম গোসল সারা গেলেও খাওয়া যাচ্ছে না। নোংরা এই পানি ব্যবহারের ফলে পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

ঢাকা ওয়াসার তথ্যমতে, রাজধানীতে দৈনিক পানির চাহিদা রয়েছে ২২৫ কোটি লিটার। আর ওয়াসার উৎপাদন ক্ষমতা ২৪৫ কোটি লিটার। ঢাকা ওয়াসা পাঁচটি শোধনাগার প্রকল্প এবং ৭১২টি পাম্পের মাধ্যমে এ পানি উৎপাদন করে থাকে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পানি সরবরাহ উইংয়ের যুগ্মসচিব মাহবুব হোসেন যুগান্তরকে জানান, ‘চাহিদার তুলনায় ঢাকা ওয়াসার উৎপাদন বেশি। তবে পানি সরবরাহ লাইনের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে কিছু কিছু এলাকায় পানির পকেট সংকট চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসা পানি সরবরাহ লাইন সংস্কারের কাজ করছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যমান পানি সংকট নিরসন হয়ে যাবে।’

জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসডিএম কামরুল আলম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার চাহিদার চেয়ে উৎপাদন ক্ষমতা বেশি থাকলেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কিছু কিছু এলাকায় পানির পকেট (ছোটখাটো) সংকট দেখা দিয়েছে। অচিরেই এই সংকট নিরসন হবে।’

সুত্র : যুগান্তর

 

লেখাটি পছন্দ হলে প্লিজ Share করুন

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ :

Related posts

Leave a Comment